নৈতিক স্খলনের অভিযোগে জামায়াত থেকে বহিষ্কার এমপি গাজী নজরুল। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২২ জুলাই: নৈতিক স্খলনের অভিযোগে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করেছে দলটি। বুধবার (২২ জুলাই) বিকেল ৪টায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধী দলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। পরে কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে গাজী নজরুল ইসলামের নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় দলের গঠন তন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে অবহিত করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
এর আগে ভিডিওকাণ্ডে শুরু হয় বিতর্ক। গত সোমবার রাতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ভিডিওতে এক তরুণীর সঙ্গে তাকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়।ভিডিও প্রকাশের পর জামায়াতের অনেক নেতা-কর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করেন, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। তবে পরে গাজী নজরুল ইসলাম নিজের ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৭ জুন প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে পারিবারিক ভাবে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
গাজী নজরুল ইসলামের দাবি, গত ১৩ জুলাই তিনি তার প্রথম স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন এবং শ্বশুর মাছুম বিল্লাহকে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে শ্বশুরের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যান। সেখানে তার গাড়িচালক ও দ্বিতীয় স্ত্রীর মামাসহ কয়েকজন কক্ষে ঢুকে তাদের জিম্মি করে এক লাখ টাকা আদায় করেন এবং আরও কয়েক লাখ টাকা দাবি করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, ওই সময় তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত গোপনে ভিডিও ধারণ করে পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং সেটিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যা তার ভাষ্য অনুযায়ী সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
গাজী নজরুল ইসলাম ১৭ জুন মরিয়ম খাতুনকে বিয়ে করার দাবি করলেও পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি বায়োডাটাকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ওই বায়োডাটায় দেখা যায়, ২২ জুন তারিখে গাজী নজরুল ইসলামের স্বাক্ষর ও ‘জোর সুপারিশ করছি’ লেখা থাকলেও ব্যক্তিগত তথ্যের অংশে মরিয়ম খাতুনের বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠলেও এ বিষয়ে গাজী নজরুল ইসলাম বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
দল থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হতে পারে। তবে দল থেকে বহিষ্কারের ক্ষেত্রে আসন শূন্য হওয়ার বিষয়ে কোনো বিধান নেই। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র দলীয় বহিষ্কারের কারণে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয় না। তবে নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ড হলে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতা হারাতে পারেন। বর্তমানে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো ফৌজদারি মামলায় দণ্ডের তথ্য নেই।
এর মধ্যে, বিতর্কের জেরে বুধবার গাজী নজরুল ইসলামের নির্বাচনী এলাকা সাতক্ষীরার শ্যামনগরে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ‘শ্যামনগরের সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচি থেকে তাকে উপজেলায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়।
গাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৯১ ও ২০০১ সালেও একই আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।