মেলবোর্ন, ২১ জানুয়ারি- ভারতে ভোটার তালিকা হালনাগাদের নামে চলমান ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক জাতীয় সম্মেলনে উপস্থাপিত জুরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অত্যন্ত তাড়াহুড়া ও অগোছালোভাবে এই সংশোধন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালার অনেক নিয়মই মানা হচ্ছে না।
গত ২০ ডিসেম্বর নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে আয়োজিত ‘সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার রক্ষা’ শীর্ষক সম্মেলনে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, বিহার, গুজরাট, তামিলনাড়ু, গোয়া ও উত্তর প্রদেশের নাগরিকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ভারত জোড়ো অভিযান, পিইউসিএল ও এনএপিএম এই সম্মেলনের আয়োজন করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের বুথ লেভেল কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত সংশোধন প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ নানা ধরনের হয়রানি ও বৈষম্যের মুখে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ করে নথিপত্র চাওয়া, তথ্যের অমিল দেখানো এবং অনুপস্থিতির অজুহাতে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে অভিবাসী শ্রমিক, দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও স্থায়ী আবাসনহীন মানুষের ওপর।
রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে কাজের খোঁজে বাইরে থাকা কৃষিশ্রমিকদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যদিও জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের আওতায় তারা ভোটার হওয়ার যোগ্য। ছত্তিশগড়ের বস্তার অঞ্চলে সালওয়া জুডুম সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষ নিবন্ধন ফরমই পাননি। স্থানীয় নেতাদের আশঙ্কা, ওই অঞ্চলে এক লাখের বেশি ভোটার বাদ পড়তে পারেন।
ধর্ম ও পরিচয়ের ভিত্তিতেও বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোটারদের ‘অবৈধ বাসিন্দা’ আখ্যা দিয়ে তালিকাভুক্তিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও বস্তি উচ্ছেদের পর পুনর্বাসনের নির্দেশ মানা না হওয়ায় বাস্তুচ্যুত মানুষদের নাম ভোটার তালিকায় রাখা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মহানগরীর বস্তিবাসী, বিশেষ করে তামিলনাড়ু ও মহারাষ্ট্রে, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছেন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, অভিজাত এলাকায় ভোটার নিবন্ধনের হার অনেক বেশি হলেও বস্তি এলাকায় তা অর্ধেকেরও কম।
বিহার ও গুজরাটে জীবিত মানুষকে ভুলবশত ‘মৃত’ ঘোষণা করে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনাও উঠে এসেছে। এতে শুধু ভোটাধিকার নয়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
নারী ও ট্রান্সজেন্ডারদের ক্ষেত্রেও সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিয়ের পর পৈতৃক গ্রাম ছেড়ে আসা নারীরা শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের ‘স্বীকৃত আত্মীয়’ হিসেবে দেখাতে না পারায় ভোটার হিসেবে যাচাইয়ে জটিলতায় পড়ছেন। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ট্রান্সজেন্ডাররাও আবাসন ও নথির অভাবে তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছেন।
জুরি প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, একজনের নাম বাদ পড়লে তার সন্তানদের নামও ঝুঁকির মুখে পড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি আধার কার্ডের সঙ্গে ভোটার তালিকা যুক্ত করার প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকায় ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদনটি বলছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এই প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক অধিকারকে দুর্বল করছে এবং অবিলম্বে স্বচ্ছ, মানবিক ও আইনসম্মত পদ্ধতিতে তা পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
সূত্র: দ্য ওয়্যার