মেলবোর্ন, ২২ জুন- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তুললেও এর অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের সৃজনশীলতা, স্মৃতিশক্তি ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। নতুন একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটি, ক্লড কিংবা জেমিনির মতো এআই টুলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা মানুষের মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে কম সক্রিয় করে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী অধ্যাপক অ্যাডাম গ্রিন বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক চিন্তার মাধ্যমে নিজেকে শক্তিশালী করে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি বারবার এআইয়ের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করেন, তখন সেই মানসিক অনুশীলনের সুযোগ কমে যায়। তার ভাষায়, “জিমে গিয়ে যদি রোবট আপনার হয়ে ভারোত্তোলন করে, তাহলে আপনার পেশি শক্তিশালী হবে না। এআইয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা একই।”
গবেষকদের মতে, অতীতে জিপিএস ব্যবহারের কারণে মানুষের দিকনির্দেশনা মনে রাখার ক্ষমতা কমে গেছে। একইভাবে সার্চ ইঞ্জিনের কারণে মানুষ তথ্য মুখস্থ করার প্রবণতা হারিয়েছে। এখন এআই আরও শক্তিশালীভাবে মানুষের মানসিক কাজকে প্রতিস্থাপন করছে। ফলে ভবিষ্যতে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল নিউরোসাইকোলজিস্ট অধ্যাপক জ্যারেড বেঞ্জে অবশ্য বিষয়টিকে একপাক্ষিকভাবে দেখছেন না। তিনি বলেন, প্রযুক্তি সব সময় মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে। এআইও তার ব্যতিক্রম নয়। এটি ক্ষতিকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে ব্যবহারকারীরা কীভাবে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করছেন তার ওপর।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত এআই ব্যবহার করেন তারা সমালোচনামূলক চিন্তার পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিজের বিচারবোধের চেয়ে এআইয়ের উত্তরের ওপর বেশি ভরসা করছেন, এমনকি এআই ভুল তথ্য দিলেও। গবেষকরা এই প্রবণতাকে “কগনিটিভ সারেন্ডার” বা চিন্তাশক্তির আত্মসমর্পণ বলে অভিহিত করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ব্যবহার করার আগে নিজে চিন্তা করার অভ্যাস বজায় রাখা জরুরি। কোনো বিষয়ে প্রথমে নিজের মতামত বা বিশ্লেষণ তৈরি করে পরে এআইয়ের সহায়তা নেওয়া হলে চিন্তাশক্তি বেশি সক্রিয় থাকে। এতে এআই বিকল্প চিন্তার সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু মানুষের বিচারবোধকে প্রতিস্থাপন করে না।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, এআই ব্যবহার করে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করলে সেই তথ্য দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখার সম্ভাবনা কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা তাই এআই থেকে পাওয়া তথ্য নোট নেওয়া, প্রশ্নোত্তর করা কিংবা নিজে লিখে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে শেখার প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের সক্রিয় অংশগ্রহণ বজায় থাকে।
সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহার করে তৈরি করা ধারণাগুলো সাধারণত বেশি পূর্বানুমানযোগ্য এবং কম মৌলিক হয়। কারণ মানুষের মস্তিষ্ক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও আবেগের সমন্বয়ে নতুন ধারণা তৈরি করে, যা কোনো অ্যালগরিদম পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কোনো লেখা, পরিকল্পনা বা সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে শুরুতেই এআইয়ের সাহায্য না নিয়ে আগে নিজস্ব চিন্তা ও ধারণা লিখে ফেলা উচিত। এরপর এআইকে ব্যবহার করা যেতে পারে সেই ধারণা উন্নত করা, ভুল খুঁজে বের করা বা বিকল্প মতামত জানার জন্য।
তারা আরও বলছেন, মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতাও প্রযুক্তির কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এআই সবকিছু দ্রুত সংক্ষিপ্ত করে দেওয়ায় অনেকেই দীর্ঘ লেখা পড়া বা জটিল বিষয় নিয়ে চিন্তা করার অভ্যাস হারিয়ে ফেলছেন। তাই সচেতনভাবে ধীরগতিতে শেখা, দীর্ঘ লেখা পড়া এবং কঠিন সমস্যার সমাধান নিজে করার অভ্যাস বজায় রাখা প্রয়োজন।
গবেষকদের মতে, এআই মানুষের জন্য শক্তিশালী সহায়ক প্রযুক্তি হলেও মানুষের সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি এবং স্বাধীন চিন্তার বিকল্প নয়। ভবিষ্যতের বিশ্বে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হবে মানুষের নিজস্ব ও মৌলিক চিন্তা। তাই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক অনুশীলন অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।