স্মরণ, নীরবতা ও প্রতিবাদ—মেলবোর্নে সরস্বতী পূজায় মানবতার বার্তা। ছবি: ওটিএন বাংলা
মেলবোর্ন, ২৪ জানুয়ারি- মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত সরস্বতী পূজায় এবার দেখা গেছে এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। ধর্মীয় উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা উঠে এসেছে পূজামণ্ডপ থেকে। পূজাকে কেন্দ্র করে এক মানবিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা প্রকাশ করে স্থানীয় কমিউনিটি।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন সংগঠন একত্র হয়ে একটি বৈশ্বিক প্রচারণা শুরু করেছে। এসব সংগঠনের দাবি, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নিপীড়ন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তাদের ভাষায় ‘ধীরে ধীরে চলমান গণহত্যা’র মতো পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি, নিহতদের স্মরণ কর্মসূচি এবং গণমোবিলাইজেশনের অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সংগঠন অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ লিমিটেড (AFERMB) এর আহবানে বেঙ্গলি পূজা এন্ড কালচারাল সোসাইটি অফ ভিক্টোরিয়া আজকে এই প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করে।
বাংলাদেশ পূজা ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ভিক্টোরিয়া (BPCSV)-এর সভাপতি প্রদ্যুৎ দে তুহিন বলেন,
“সরস্বতী পূজা আমাদের জ্ঞান, শান্তি ও মানবতার প্রতীক। কিন্তু আজ আমরা যখন পূজা করছি, তখন বাংলাদেশে আমাদের ভাইবোনেরা ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। এই প্রতিবাদ কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, এটি মানবাধিকারের পক্ষে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক পীযূষ দত্ত বলেন,
“বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে সহিংসতা চলছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা চাই বিশ্ববাসী এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করুক এবং নির্যাতন বন্ধে আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।”
অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ লিমিটেড (AFERMB)-এর পরিচালক ও সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. জহর ভৌমিক বলেন,
“বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংকট। প্রবাস থেকে আমরা যে প্রতিবাদ জানাচ্ছি, তা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেওয়ার একটি প্রয়াস।”

প্রবাস থেকে প্রতিবাদ, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দাবি। ছবি: ওটিএন বাংলা
প্রতিবাদ সভায় কমিউনিটির সদস্যরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের দাবি জানান। তারা বাংলাদেশে আটক ও নির্যাতিতদের মুক্তির আহ্বান জানান, বিশেষ করে চিন্ময় প্রভুসহ সকল বন্দির মুক্তির দাবি তোলেন।
একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
পূজার আনুষ্ঠানিকতায় নিহতদের স্মরণে নাম পাঠ, নীরবতা পালন এবং বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের ভাষায়, এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব রক্ষার পক্ষে একটি নৈতিক অবস্থান।
মেলবোর্নের সরস্বতী পূজায় এই ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি মানবাধিকারের প্রশ্নে সচেতনতা ও আন্তর্জাতিক সংহতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগকে অনেকেই সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।