আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…
মেলবোর্ন, ২৪ জানুয়ারি: বাংলাদেশের ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফাঁস হওয়া একটি মার্কিন কূটনৈতিক অডিও রেকর্ডিংয়ে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ওয়াশিংটনের যোগাযোগ ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মূল্যায়নের তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় বিদেশি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, শেখ হাসিনার পতন পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না।
২২ জানুয়ারি ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত ওই অডিওতে একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কূটনীতিককে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং শেখ হাসিনার পতনের পর রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে শোনা যায়। এতে ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাংলাদেশের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মোহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ফাঁস হওয়া অডিও আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হলো—শেখ হাসিনার পতন কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল ছিল না।
ওই অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার একটি রেকর্ডকৃত বক্তব্যও প্রচার করা হয়। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনকে “অবৈধ” আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র আন্দোলন সহিংস রূপ নেওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন এবং এরপর থেকে দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
মোহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ফাঁস হওয়া অডিওতে মার্কিন কূটনীতিক যেভাবে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ফলাফল নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলেছেন, তা নিছক বিশ্লেষণ নয় বরং আগাম পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের মতো বড় রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হলে জনগণের একটি বড় অংশ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে এবং এতে দুর্বল বৈধতা নিয়ে সরকার গঠিত হতে পারে।
ফাঁস হওয়া অডিওতে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বরের একটি কথোপকথনের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে একজন মার্কিন কূটনীতিক বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা করেন। সেখানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ “ইসলামমুখী হয়ে উঠেছে” এবং জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য শক্তিশালী নির্বাচনী সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন।
অডিওতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র শুধু জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেই নয়, তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির এবং অন্যান্য রক্ষণশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহী। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরতা—বিশেষত তৈরি পোশাক খাত—কে একটি নিয়ন্ত্রণমূলক উপাদান হিসেবে তুলে ধরা হয়।
কূটনীতিকের মতে, ইসলামপন্থী সরকার নারী অধিকার, সংখ্যালঘু সুরক্ষা বা শিক্ষানীতিতে “লাল রেখা” অতিক্রম করলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ দ্রুত অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে পারে।
এই ধরনের কৌশল নতুন নয়। আরব বসন্তের পর মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের ধারণা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সামরিক শাসনের প্রত্যাবর্তন ঘটে।
আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনাও একই ধরনের ধারণার ওপর ভিত্তি করে ছিল, যা ক্ষমতা অর্জনের পর কার্যকর হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে ফাঁস হওয়া অডিওতে মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশংসা নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। মার্কিন কূটনীতিক ইউনূসের রাজনৈতিক দক্ষতা, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সঙ্গে আচরণ এবং শেখ হাসিনার পতনের পর দেশকে স্থিতিশীল করার ভূমিকার প্রশংসা করেন। তাঁকে কেবল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নয়, বরং এমন একজন রাজনৈতিক ব্যবস্থাপক হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার নেতৃত্বাধীন পরিবর্তনকে ওয়াশিংটন স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে গ্রহণ করছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র ইউনূসকে ক্ষমতায় বসিয়েছে—এমন সরাসরি প্রমাণ নেই, তবে কূটনীতিকের বক্তব্যের সুর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিরপেক্ষতার দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং ইসলামপন্থী শক্তির কাছে বার্তা যায় যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মূলত ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
এই সমীকরণে ভারত অনুপস্থিত। অথচ বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতি ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা, পূর্বাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং উগ্রবাদ দমনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
জামায়াতে ইসলামি ও ইসলামী ছাত্রশিবির ঐতিহাসিকভাবে ভারতের স্বার্থবিরোধী অবস্থান নিয়েছে এবং সহিংস আন্দোলন সংগঠনে সক্ষম। শেখ হাসিনার শাসনামলে এসব শক্তি নিয়ন্ত্রিত ছিল, যা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা কৌশলের অন্যতম ভিত্তি ছিল।
ফাঁস হওয়া অডিও যুক্তরাষ্ট্রের ভারতবিরোধী মনোভাবের প্রমাণ না হলেও দুই দেশের অগ্রাধিকারে ব্যবধান স্পষ্ট করেছে। ওয়াশিংটন মনে করে বাজার ও অর্থনীতি আদর্শগত উগ্রতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু ভারতের অভিজ্ঞতা বলছে—আদর্শবাদ অনেক সময় অর্থনৈতিক হিসাবের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন হলে নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে, কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তাৎক্ষণিক এবং বাস্তব। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে এক আওয়ামী লীগ সমর্থক বলেন, ফাঁস হওয়া অডিও “ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দিয়েছে” এবং দেখিয়েছে কীভাবে ওয়াশিংটন নির্ধারণ করতে চায় কে ক্ষমতায় আসবে এবং কে ক্ষমতা হারাবে।
তার মতে, গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা, বিএনপির ওপর চাপ, জামায়াতে ইসলামির বিষয়ে আশ্বাস এবং পোশাক খাতকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ধারণা—সব মিলিয়ে এটি ছিল “কূটনীতির মোড়কে মোড়ানো চাপ প্রয়োগ”। মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশংসা আরও প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনটি দেশের জনগণের ইচ্ছার চেয়ে বহিরাগত স্বার্থের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে দিল্লির কাছে স্থিতিশীলতা মানেই ছিল রাজনৈতিক সমন্বয়। এখন সেই সমীকরণ আর কার্যকর নয়।
ফাঁস হওয়া অডিও হয়তো সরাসরি ক্ষমতা পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র প্রমাণ করে না, তবে এটি —ওয়াশিংটন অংশীদারিত্বের চেয়ে নমনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ঢাকায় বিকল্প পথ খুঁজছে। ভারত চায় নিশ্চিততা। এই দুই বাস্তবতাকে গুলিয়ে ফেলাই হবে সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল।
লেখক: রামানন্দ সেনগুপ্ত
(অনুবাদ: OTN বাংলা, উৎস: stratnewsglobal.com)
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au