নয়াদিল্লিতে ভবন ধসে নিহত বেড়ে ৬, কারণ জানালো কর্তৃপক্ষ
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায় একটি পুরনো ভবন ধসে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন। রোববার ভবনটির বেসমেন্টে সংস্কারকাজ…
মেলবোর্ন, ৩০ জানুয়ারি- বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভারতবিরোধী ক্ষোভের মধ্যে এবার সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে দেশের প্রধান গণমাধ্যমগুলো। সরকারবিরোধী ক্ষোভ, এক তরুণ নেতার হত্যাকাণ্ড এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো উসকানিমূলক প্রচারণা মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাংবাদিকরাই এখন জনরোষের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছেন।
২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর ভোররাতে ঢাকার সংবাদপত্র পল্লীতে ভয়াবহ দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার কার্যালয়ে হামলা চালায় একদল বিক্ষুব্ধ মানুষ। অনেকেই মুখোশ পরা ছিল, কারও হাতে ছিল লোহার রড। তারা অফিস ভাঙচুর করে, কম্পিউটার ও সম্প্রচার সরঞ্জাম ধ্বংস করে এবং ভবনের অংশবিশেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। আতঙ্কিত সাংবাদিকরা প্রাণ বাঁচাতে বিভিন্ন দিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কোথাও ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়া দায় হয়ে পড়ে, কোথাও জরুরি সিঁড়িপথ বন্ধ হয়ে যায় ধ্বংসাবশেষে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে গণপিটুনিসহ বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। দ্য ডেইলি স্টারের এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, মনে হচ্ছিল আমাদের শিকার করা হচ্ছে। তারা শুধু সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল না, সত্য তুলে ধরার কারণেই আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে।
এই সহিংসতার সূত্রপাত হয় শরিফ ওসমান হাদি নামের এক তরুণ রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। ভারতবিরোধী বক্তব্যের জন্য পরিচিত ৩২ বছর বয়সী হাদি ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন। ছয় দিন পর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা দ্রুত সহিংস রূপ নেয় এবং সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যমকেও নিশানা করা হয়।
হাদি ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন, যে আন্দোলনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। ইনকিলাব মঞ্চ নামে একটি প্ল্যাটফর্মের মুখপাত্র হিসেবে হাদি শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারের অভিযোগ তুলতেন এবং দাবি করতেন, কৌশলগত স্বার্থে ভারত তার সরকারকে রক্ষা করেছে।
হাদির মৃত্যুর পরপরই নানা জল্পনা ছড়াতে থাকে। সামাজিক মাধ্যমে প্রমাণ ছাড়াই বলা হয়, হামলাকারীরা ভারতে পালিয়েছে। “ভারত হাদিকে হত্যা করেছে” স্লোগানটি দ্রুত বিক্ষোভের মূল সুর হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন মানুষের মৃত্যুর বিচার চাওয়ার চেয়ে এই ঘটনা জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র, ক্ষমতাধর গোষ্ঠী এবং ভারত।
এই ক্ষোভের সরাসরি আঘাত গিয়ে পড়ে গণমাধ্যমের ওপর। বিক্ষোভকারীদের চোখে যেসব সংবাদমাধ্যমকে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ বা ভারতের বিষয়ে নরম বলে মনে হয়েছে, সেগুলোই হামলার শিকার হয়। ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের অফিসে হামলার সময় দেড় শতাধিক ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ লুট করা হয়, ভবনের অংশবিশেষ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। একই সময় দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই দুই বড় পত্রিকা একসঙ্গে মুদ্রণ ও অনলাইন প্রকাশনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।
সহিংসতা শুধু সংবাদমাধ্যমে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেও হামলা হয়। নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবির অন্য সাংবাদিকদের সাহায্য করতে গিয়ে হামলার শিকার হন। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক সংস্থাগুলো এসব ঘটনাকে গভীর উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে।
এই অস্থিরতায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়েছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাংবাদিকরা। ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে হিন্দু সাংবাদিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ কিছু অভিযোগের কথা বললেও সহকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। যশোরে এক হিন্দু শিল্পপতি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন এবং খুলনায় এক হিন্দু নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হন। এসব ঘটনায় সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশে অনেক সময় হিন্দু সম্প্রদায়কে ভারতের সঙ্গে এক করে দেখা হয়। ফলে ভারতবিরোধী আবেগ বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি তাদের ওপর পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার হামলার নিন্দা জানালেও সমালোচকদের মতে, সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে শত শত সাংবাদিককে আটক বা মামলা দেওয়া হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ অস্পষ্ট।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক স্লোগানের আড়ালে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক হতাশা। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং মহামারির পর অর্থনৈতিক ধাক্কায় তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ জমেছে। ছাত্র কোটা সংস্কার থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষে রূপ নেয়। এই ক্ষোভের সহজ লক্ষ্য হিসেবে সামনে আসে ভারত।
সামাজিক মাধ্যম এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিভ্রান্তিকর ভিডিও, ভুয়া দাবি ও অতিরঞ্জিত তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফ্যাক্টচেক সংস্থাগুলো অনেক দাবি মিথ্যা প্রমাণ করলেও ততক্ষণে উত্তেজনা ছড়িয়ে যায়। একদিকে ভারত-সংশ্লিষ্ট প্রভাব বিস্তারমূলক প্রচারণা, অন্যদিকে দেশের ভেতরের গুজব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে।
এই অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও। শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার পর থেকে সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণ চাইলেও ভারত সাড়া দেয়নি, যা দুই দেশের সম্পর্কে বড় বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় ভারত কড়া প্রতিক্রিয়া জানালে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে।
বর্তমানে বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নীচের দিকে। অনেক সম্পাদক বলছেন, সত্য প্রকাশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সামনে নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন সাংবাদিকরা। তাদের ভাষায়, যখন সত্য বলাই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রই সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়ে।
সূত্রঃ নিউজ ডেকর
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au