আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…
মেলবোর্ন, ২ ফেব্রুয়ারি- বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এখন এক ধরনের সর্বগ্রাসী আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। আল–জাজিরার জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য লিসেনিং পোস্ট’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশে মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা দৃশ্যমান হলেও ভিন্নমত প্রকাশ করলেই আক্রমণের আশঙ্কা কাজ করে, যা গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতিনিয়ত মানসিক চাপে রাখছে।
সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আনাম বলেন, বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যম এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অনুসন্ধানী ও স্বাধীনভাবে কাজ করছে। স্বাধীন চিন্তা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরিমাণও বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এমন এক ভয় কাজ করছে, যেখানে কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া মতাদর্শ থেকে সামান্য সরে গেলেই হামলা বা আক্রমণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে অনেক সময় সাংবাদিকদের শব্দ চয়ন নিয়েও অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হচ্ছে। কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে, কোনটি বাদ দেওয়া হবে, তা নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়। তার ভাষায়, এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার আদর্শের পরিপন্থী হলেও বাস্তবতা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে এই সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
ডেইলি স্টার ভবনে হামলার প্রসঙ্গ টেনে মাহফুজ আনাম বলেন, যারা হামলা চালিয়ে ভবনে আগুন দিয়েছে, তারা ডেইলি স্টারের পাঠক ছিল না বলেই তার ধারণা। তাহলে তারা কেন এই হামলা চালাল, সে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটি একটি সুপরিকল্পিত আক্রমণ ছিল। এর পেছনে রাজনৈতিক ও আর্থিক উদ্দেশ্য ছিল এবং একই সঙ্গে গণতন্ত্র, বহুমতের স্বীকৃতি ও ভিন্নমতকে সমর্থন করা উদার সাংবাদিকতার ঐতিহ্য ধ্বংস করাই ছিল তাদের লক্ষ্য।
মাহফুজ আনাম বলেন, কোনো প্রতিবেদনে ভুল থাকলে সমালোচনা করা যেতে পারে, প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং ভয়ংকর বার্তা দেয়।
ডেইলি স্টার ভবনে হামলার রাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেটি ছিল চরম আতঙ্কের একটি রাত। ভবনের ভেতরে আটকে পড়া কর্মীদের নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তিনি ফোনে নিউজরুমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। তখন কর্মীরা তাকে বলছিলেন, হয়তো আর দেখা হবে না। অনেকেই তাদের বাবা-মা, স্ত্রী, স্বজন ও বন্ধুদের ফোন করে শেষবারের মতো কথা বলার চেষ্টা করছিলেন।
সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আনাম বলেন, বাংলাদেশে মতপ্রকাশের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এই স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে ভুয়া খবর, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং ভিত্তিহীন অভিযোগও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এখানেও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ ও হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সচেতনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু রাজনৈতিক দল আলাদা টিম গঠন করে পরিকল্পিতভাবে এই সুযোগ নিচ্ছে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করলেই হঠাৎ শত শত মানুষ গালি দিতে শুরু করে, আবার প্রশংসা করলে একইভাবে শত শত মানুষ সমর্থনে নেমে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এমন রাজনৈতিক ব্যবহার এখন খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে গেছে।
ডেইলি স্টার সম্পাদক আরও বলেন, ডেইলি স্টার ভবনে হামলার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজর রাখলে দেখা যায়, একজন প্রভাবশালী ইনফ্লুয়েন্সার প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “প্রথম আলো ডান, ডেইলি স্টারে চলে আসেন।” তার মতে, এটি ছিল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডেইলি স্টারকে ধ্বংস করার একটি চেষ্টা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার একটিও প্রমাণিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে বক্তব্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রেক্ষাপটের বাইরে তুলে ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে এটি ছিল বাংলাদেশের দুটি প্রভাবশালী মূলধারার গণমাধ্যমকে হেয় করার একটি সুসংগঠিত ও কার্যকর পদ্ধতি।
গণমাধ্যমের রাজনীতিকরণ কীভাবে জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সে বিষয়ে মাহফুজ আনাম বলেন, বছরের পর বছর ধরে সাংবাদিক সমাজ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কেউ একটি দলের ঘনিষ্ঠ, কেউ অন্য দলের। একজন সাংবাদিকের মূল দায়িত্ব সত্য বলা হলেও, যখন তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তখন পাঠক ও দর্শকের কাছে সেই গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানুষ তিনটি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং এখন চতুর্থ নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। এ কারণে এবারের নির্বাচন নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। জনগণ এমন একটি ভোট দেখতে চায়, যেখানে তাদের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে।
মাহফুজ আনাম বলেন, ভবিষ্যতে যে সরকারই নির্বাচিত হোক, তাদের শেখ হাসিনার পতনের কারণগুলো মনে রাখা উচিত। তার মতে, হাসিনার পতনের অন্যতম কারণ ছিল সরকারের দমনমূলক চরিত্র এবং গণমাধ্যমের প্রতি তার আচরণ।
তিনি বলেন, হাসিনার শাসনামলের শেষ ১৫ বছরকে সংক্ষেপে বোঝাতে চাইলে একটি বিষয়ই যথেষ্ট, আর সেটি হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই আইন ভিন্নমতের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এতে ২০টি শাস্তির বিধান ছিল, যার মধ্যে ১৪টিই ছিল জামিন অযোগ্য। তার মতে, এটি ইচ্ছাকৃতভাবেই একটি ভয়ার্ত পরিবেশ তৈরি করার জন্য করা হয়েছিল, যার ফলে সমাজ কার্যত নীরব হয়ে পড়ে।
মাহফুজ আনাম বলেন, এই দমনমূলক নীতিতে কাউকেই ছাড় দেওয়া হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে কার্টুনিস্ট ও শিক্ষকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের শীর্ষস্থানীয় সম্পাদকীয় কণ্ঠগুলোর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে বিচারিক হয়রানি চালানো হয়েছে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে ৮৩টি মামলা করেছেন। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ডেইলি স্টারের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার ফলে পত্রিকার আয় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ কমে যায়। তার কোনো প্রতিবেদককেই কখনো প্রধানমন্ত্রীর কোনো অনুষ্ঠান কাভার করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এমনকি সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে তাকে আক্রমণ করেছেন।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে মাহফুজ আনাম আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যৎ সরকারগুলো এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেবে এবং বাংলাদেশে একটি মুক্ত, স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যাবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au