রাষ্ট্রের উদাসীনতায় আটকে বিচার, স্বজনদের নীরব কান্নাই যেন ‘তীব্র প্রতিবাদ’
মেলবোর্ন, ৬ মার্চ- যশোরে উদীচীর সম্মেলনে ভয়াবহ বোমা হামলার ২৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি বিচার প্রক্রিয়া। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করা যায়নি, চূড়ান্ত শাস্তিও…
মেলবোর্ন, ৪ ফেব্রুয়ারি:
টুং টাং.. আপা কই যাবেন?
কোথায় যেন যাবো আমি? নতুন বাজার, গুলশান, বনানী, বাড্ডা। এক মুহূর্তে যেন থমকে গেলো আমার পৃথিবী৷ আমি পৃথিবীর মাটিতেই দাঁড়িয়ে, কিন্তু এই মাটির সাথে আমার কোন পরিচয় নেই। আমি পৃথিবীর আলো- বাতাসের মাঝেই দাঁড়িয়ে, কিন্তু এই আলোয় যেন আমি কোনদিন পৃথিবী দেখিনি। এই বাতাসের গন্ধ আমার চেনা পৃথিবীর নয়। এই প্রকৃতির শব্দের সাথে আমার কানের কোন সখ্যতা নেই। নির্মল, সুন্দর, স্নিগ্ধ, কিন্তু তবুও তাদের সাথে আমার কোন প্রেম নেই, কোন পরিচিতি নেই, কোন আলাপ নেই। চারিদিকে পাখির কিচিমিচি শব্দ আছে। কিন্তু এ তো আমার গ্রামের পাকা ধানের গন্ধ মাখা, শিমুল, পলাশ বা শিউলি সুরভিত কোকিল ডাকা সকাল নয়। এ তো আমার শহরের সবজিওয়ালার গলার স্বর, রিক্সার বেল, গাড়ির হর্ন আর কাক ডাকা চির চেনা সকালও নয়। চারিদিক শান্ত, বইছে হিমেল হাওয়া, পাখিও ডাকে।
কিন্তু আমার মস্তিষ্ক যেন মানতেই নারাজ যে, দোয়েল, কোয়েল, ময়না, টুনটুনি, কাক, কোকিল ছাড়া অন্য পাখিরাও ডাকে৷ তারাও কিচিমিচি শব্দে রিক্সার টুং টাং শব্দের বাইরের পৃথিবীর মানুষদের সকালকে মুখরিত করে রাখে। কিছুক্ষণ এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে কাটে বিদেশের মাটিতে প্রথম সকালের প্রথম কিছু মুহূর্ত।
আগের দিন রাত্রেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিলো সকালে উঠে ফ্রেশ হয়েই কাছের ট্রেন স্টেশনে যাওয়া হবে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কার্ড নিতে। ক্লান্ত শরীরে ঘুম ভাঙতেও দেরি হয়েছে। তাই বাইরে যাবার জন্য রেডি হবার আগ মুহূর্ত পর্যন্তও যেন এক অন্যরকম ঘোরেই ছিলাম। কিন্তু ঘোর কাটলো যখন বাসার বাইরে প্রথম পা রাখলাম। আমার বুক কেঁপে উঠলো। আগের দিনতো এয়ারপোর্টে কাগজপত্র, ইমিগ্রেশনের লম্বা লাইন, লাগেজ আর প্রিয় মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার উৎকন্ঠায় পার হয়ে গেছে সবকিছু।
কিন্তু এখন? এখন কোথায় যাবো? কাকে জিজ্ঞেস করবো ট্রেন স্টেশন কত দূর?
এখানে নাকি কাওকে জিজ্ঞেস করতে হয় না। এখানে রাস্তা চেনায় গুগল ম্যাপ। আমার দেশও পিছিয়ে নেই, আমার দেশেও গুগল ম্যাপ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সবার আগে আমরা ম্যানুয়ালে বিশ্বাসী।
আমরা আগে জনে জনে জিজ্ঞেস করে নিরুপায় না হওয়া পর্যন্ত গুগল ম্যাপের দারস্থ হতে রাজি নই। কিন্তু এখানে নাকি সবই উলটো। এ এক উলটো পৃথিবী। গুগল ম্যাপ নিয়ে এক্সট্রিম লেভেলের গন্ডগলে কিছু না হলে এখানে কেউ কাওকে জিজ্ঞেস করে না।
আমরাতো শুধু এক রাস্তা- ঘাট জিজ্ঞেস করার দৌলতে কত মামা, কাকা, ভাই বোন পাতিয়ে ফেলি কত জনকে। এদের নাকি সেসব কিছু হয় না। এদের রাস্তা ঘাটে বেরোলে একটাও মামা পাওয়া যায় না। অথচ আমাদের কত মামা। সবজিওয়ালা মামা, রিক্সাওয়ালা মামা, বাস ড্রাইভার মামা, কন্ট্রাক্টর মামা, মুদি মামা, ফ্লেক্সি মামা, দরজি মামা কত শত মামা কত শত ভাই।
এখানে কেউ নেই। যদিও আমি একা ছিলাম না, আমার সাথে ছিলো আমার কাছের মানুষটি, আমার মেয়ে আর আমাদের এক বন্ধু যার বাসায় এসে আমরা উঠেছিলাম। তাই প্রথম জানাটা যদিও আমাদের গুগল ম্যাপের থেকে জানতে হয়নি, আমাদের বন্ধুই তখন বলে দিয়েছিলো যে স্টেশনে যেতে আমাদের পনেরো মিনিট হাঁটতে হবে। এ কথা শুনে মনের অজান্তেই চোখ চলে গেলো এদিক ওদিক রিকশার খোঁজে।
রাজশাহীতে আমি যে মেসে থাকতাম সেখান থেকে সিটি কলেজে অলিগলি দিয়ে হেঁটে যেতে তিন থেকে চার মিনিট সময় লাগতো। একবার পরীক্ষায় সিটি কলেজে আমার সিট বসেছিলো। আর পরীক্ষার সময় স্বাভাবিকভাবেই মেইন রাস্তায় একটু জ্যাম থাকে। কিন্তু আমি হলাম সেই রাজকন্যা যে কিনা প্রতিটি পরীক্ষার দিন ওই তিন- চার মিনিটের হাঁটার রাস্তা ছেড়ে দশ-পনেরো মিনিট ধরে রিক্সা নিয়ে মেইন রাস্তা দিয়ে ঘুরে ঘুরে পরীক্ষার হলে সবার শেষে ঢুকতাম। সেই সময়ে আমার কি অদ্ভুত চিন্তাশক্তি, আমার নাকি টেনশন হতো হাঁটলে। হেঁটে গেলে লিখতে পারবো না টেনশনে। রিক্সায় বসলে রিল্যাক্স হবে। আহাঃ জীবন!
কোথায় আমার রিক্সা মামা। চারিদিকে রিক্সার কোন ছায়াও নেই। যতদুর চোখ গেলো শুধু দু একটা প্রাইভেট কার চোখে পড়লো। নেই, এখানে আমার কোন রিকশা মামারা নেই । আমার দেশের রিক্সা মামারা আবার তাদের ভাগ্নিদের ভাগ্নি ডাকে না। আপা ডাকে।
তাই না হয় ডাকলো। কিন্তু সেদিন কেউ একবারও ডাকলো না আপা কোথায় যাবেন? কেউ রিকশার বেল বাজালো না। কোন দরকষাকষি হলো না। কেবল পা দুটোই এগুতে থাকলো সামনের দিকে, একই গ্রহের অন্য এক দুনিয়ায়। রিকশার শূন্যতা এক মুহূর্তে বুঝিয়ে দিলো, রাজকন্যা তুমি এখন অন্য রাজার অন্য রাজত্বে। তোমার চেনা পৃথিবীর খোলস ছেড়ে, তোমার নরম বিছানা ছেড়ে তুমি এসেছো পৃথিবীর আরেক রূপের স্বাদ নিতে।
এখানে সবাই শুধু ছোটে, পৃথিবীর সাথে পাল্লা দিয়ে ছোটে। এখানে মানুষ কাজে যেতে ছোটে, কাজ না থাকলেও ছোটে, শরীর সুস্থ রাখতে ছোটে, অসুস্থ হলেও ছোটে। তুমিও প্রথম সকাল থেকেই ছুটতে থাকো। সেই থেকে শুরু হলো রিকশার শূন্যতা নিয়ে রিকশা থেকে নেমে নতুন করে হাঁটা শেখা।
এরপর রিকশার হাহাকার নিয়ে দিনে দিনে বহু ঘটনা যুক্ত হতে থাকলো বিদেশ জীবনের ডায়েরিতে। ভুল রাস্তায় গিয়ে রোদে পুড়ে বাস স্টপ খুঁজে পেতে চল্লিশ মিনিট হাঁটা, দুই ডিগ্রি তাপমাত্রায় বাস বন্ধ ছিলো সেটা না জেনেই বের হয়ে গিয়ে এক ঘন্টা মেয়েকে নিয়ে হাঁটা, আটত্রিশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় জনশূন্য এলাকা দিয়ে ত্রিশ মিনিট হাঁটা। এমন কতশত ঘটনা ঘটে চলে প্রতিনিয়ত তবু কেউ একবারও ডেকে বলে না, টুং টাং, আপা কই যাবেন?
এখন রিকশা আর আমাদের বয়ে নিয়ে যায় না, এই অচেনা দেশে অজানা শহরে আমরা রিকশাকে বয়ে নিয়ে যাই আমাদের স্মৃতির পাতায়।

লেখক: বনলতা সরকার তিথি
বনলতা সরকার তিথি, মেলবোর্ন থেকে
মেলবোর্ন, ৪ ফেব্রুয়ারি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au