‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…
মেলবোর্ন, ৫ ফেব্রুয়ারি- জানুয়ারির শেষ দিকে ঢাকার ব্যস্ত সড়কে অটোরিকশা চালাতে চালাতে রুবেল চাকলাদারের কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে ছিল ক্লান্ত আত্মসমর্পণের সুর। ৫০ বছর বয়সী এই চালকের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ যে একটি বিরল সুযোগ পেয়েছিল, জাতি সেটি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। ওই অভ্যুত্থানে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগে বাধ্য হন। তাঁর শাসনামলে কর্তৃত্ববাদ, বিরোধী দমন ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল।
ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের চাপে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করার তিন দিনের মাথায় দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস। ৮৫ বছর বয়সী ইউনূসের সামনে তখন বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একটি রক্তাক্ত গণআন্দোলনের পর ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা। ওই আন্দোলনে প্রাণ হারান অন্তত ১ হাজার ৪০০ জন।
দায়িত্ব নেওয়ার সময় ইউনূস তাঁর লক্ষ্য নির্ধারণ করেন সীমিত কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষীভাবে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদে ফিরে যাওয়ার পথ বন্ধ করা। তবে রুবেল চাকলাদারের মতে, প্রশাসনের ভেতরের প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং চরমভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলো ইউনূসকে যথেষ্ট সমর্থন দেয়নি। ফলে তাঁর ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী শাসনামলে কাঙ্ক্ষিত বড় পরিবর্তন আসেনি।
আল জাজিরাকে রুবেল বলেন, আমরা সুযোগটা নষ্ট করেছি। আমরা ড. ইউনূসকে ঠিকভাবে কাজ করতে দিইনি। অযৌক্তিক দাবিতে কে রাস্তায় নামেনি। জুলাইয়ে মানুষ জীবন দিল, সবই যেন বৃথা গেল।
এই মূল্যায়ন এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম তুলনামূলকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোতে থাকা বাংলাদেশে এখনই শুরু হয়ে গেছে ইউনূসের উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক। কেউ তাঁকে দেখছেন ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করা এক স্থির নেতৃত্ব হিসেবে, আবার কেউ মনে করছেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের যে কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি ছিল, তা বাস্তবায়নে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।
ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের কাছে ইউনূসের আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং দেশের ভেতরে নাগরিক সমাজের নেতা হিসেবে সুনাম ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ যখন বৈশ্বিক আস্থাহীনতার মুখে, তখন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন মুখ দরকার ছিল। জাতীয় নাগরিক পার্টির সভাপতি এবং সাবেক ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, তখন এমন একজন দরকার ছিল, যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। বিকল্প ভাবতে গিয়ে ইউনূস ছাড়া কাউকে পাওয়া যায়নি।
আরেক ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাঙন আর আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে নৈতিক কর্তৃত্বসম্পন্ন কাউকে দরকার ছিল। তিনি দাবি করেন, ইউনূসের নিয়োগ রাষ্ট্রের ভেতরে সর্বসম্মত ছিল না এবং সামরিক বাহিনীর একটি অংশের আপত্তিও ছিল, যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শুরুতে ইউনূস নিজেও দ্বিধায় ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি রাজনীতির মানুষ নন। কিন্তু আন্দোলন তীব্র হওয়া এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় এক ধরনের দায়িত্ববোধ থেকে তিনি এগিয়ে আসেন বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রিয়াজ। তিনিই পরে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে ইউনূসের আস্থাভাজন হন।
তবে দেড় বছর পরেও ইউনূসকে সমর্থন দেওয়া অনেকের মধ্যেই হতাশা রয়ে গেছে। আসিফ মাহমুদ বলেন, তারা জাতীয় ঐক্যের সরকার চেয়েছিলেন, সেটি হয়নি। তবু রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি কঠোর পুনর্গঠন প্রত্যাশা ছিল।
অন্যদিকে ইউনূসের শাসনামল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী সংস্কার উদ্যোগগুলোর একটি। নির্বাচিত সংসদ না থাকায় তাঁর সরকার বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ কমিশনের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব দেয়। শেখ হাসিনার আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও বিরোধী দমনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গঠন করা হয় একাধিক তদন্ত কমিশন।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ নথিভুক্ত করে, যাচাই করে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনা এবং ২৮৭ জনকে নিখোঁজ বা মৃত হিসেবে চিহ্নিত করে। এসব ঘটনায় পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে আসে। গবেষক মুবাশ্বার হাসানের মতে, এই কমিশনই ইউনূসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, কারণ এটি প্রমাণ করেছে যে হাসিনার আমলে নির্যাতন ছিল প্রাতিষ্ঠানিক।
তবে তাঁর শাসনামলে আমলাতান্ত্রিক সংস্কার প্রত্যাশামতো হয়নি বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী। তাঁর মতে, অনির্বাচিত সরকারের সীমাবদ্ধতা এবং কাঠামোগত প্রতিরোধের কারণে ইউনূস আমলাতন্ত্রের শক্ত অবস্থান ভাঙতে পারেননি।
ইউনূস তাঁর শাসনের শেষ পর্যায়ে এসে আরেকটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে গণভোট আয়োজনের চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর সমর্থকদের মতে, দমনমূলক ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এসব সংস্কারের জন্য জনগণের সম্মতি জরুরি।
এই গণভোটে জনগণ সমর্থন দিলে পরবর্তী সংসদ সংস্কার বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেবে। না হলে উদ্যোগগুলো থমকে যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তাই অনেক বিশ্লেষকের কাছে ইউনূসের উত্তরাধিকারকে সংজ্ঞায়িত করে।
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ইউনূস দেশকে স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রেখেছেন, তবে স্বল্প সময়ে সবকিছু করার প্রবণতা ছিল। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও অর্থনীতি ছিল নাজুক, বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির ছিল।
জামায়াতে ইসলামীও মনে করে, ইউনূস সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন এবং অগ্রগতি হয়েছে, তবে এর জন্য সময় দরকার।
ছাত্রনেতাদের মূল্যায়নে শ্রদ্ধা আর হতাশা পাশাপাশি। নাহিদ ইসলাম বলেন, ইউনূস ঐক্য গড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক দরকষাকষিতে তাঁর সরকার দুর্বল ছিল।
অন্যদিকে শহীদ পরিবারের সদস্য সানজিদা খান দীপ্তির কাছে ইউনূস স্মরণীয় হবেন ন্যায়বিচারের চেষ্টা হিসেবে। তাঁর ১৭ বছরের ছেলে আনাস ২০২৪ সালের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। তিনি বলেন, আমরা সন্তানের জীবন দিয়েছি ন্যায়বিচারের জন্য। এক অন্ধের দেশে আয়নার মূল্য থাকে না। এত অল্প সময়ে একজন মানুষ কীভাবে সব শেষ করবে।
ঢাকার যানজটে ফিরে গিয়ে রুবেল চাকলাদার বলেন, তিনি ভোট দেবেন। পরিবর্তনের আশা থেকে নয়, বরং আর কিছু করার না থাকায়। তাঁর ভাষায়, এই নির্বাচন তাঁর জীবন বা দেশের বাস্তবতায় তেমন কোনো পরিবর্তন আনবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au