হারারের মাটিতে লেখা হলো ভারতীয় ক্রিকেটের আরেকটি স্বর্ণালি অধ্যায়।
মেলবোর্ন, ৭ ফেব্রুয়ারি- হারারের মাঠে ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে যোগ হলো আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়। ১৪ বছর বয়সী বিস্ময়বালক বৈভব সূর্যবংশীর রেকর্ডগড়া ১৭৫ রানের অতিমানবীয় ইনিংসে ভর করে ইংল্যান্ডকে একপ্রকার বিধ্বস্ত করে অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নিল ভারত। এই জয়ে ষষ্ঠবারের মতো যুব বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো তারা, যা এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
টসে জিতে ব্যাটিং নেওয়ার পর থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন সূর্যবংশী। মাত্র ৮০ বলে ১৭৫ রানের বিধ্বংসী ইনিংসে ইংল্যান্ডের বোলিং আক্রমণের কোনো জবাবই রাখেননি তিনি। শক্তি, নিখুঁত টাইমিং আর নির্ভীক আগ্রাসনের অপূর্ব মিশেলে সাজানো এই ইনিংস দ্রুতই ফাইনালকে একপেশে করে তোলে।
তৃতীয় ব্যাটার হিসেবে সূর্যবংশী যখন আউট হন, তখন মাত্র ২৬ ওভারে ভারতের সংগ্রহ ২৫১ রান, উইকেট তিনটি। তখন স্কোরবোর্ডের গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছিল, ভারত ৫০০ রানের দিকেই এগোচ্ছে। তাঁর গতির সঙ্গে ইংল্যান্ডের কোনো বোলারই তাল মেলাতে পারেননি। পরে অভিজ্ঞান কুন্ডু ও কনিষ্ক চৌহানের ঝড়ো ক্যামিওতে ভারত প্রথমবারের মতো ফুল মেম্বার দেশগুলোর যুব ওয়ানডেতে ৪০০ রানের গণ্ডি পেরোয়।
ইনিংসের শুরুতেই সূর্যবংশী অধিনায়ক আয়ুশ মহাত্রের সঙ্গে ১৫ ওভারে ১৪২ রানের বিধ্বংসী জুটি গড়েন। এরপর ভেদান্ত ত্রিবেদীর সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে ৮৯ রানের জুটিতেও ছিল তাঁর একক আধিপত্য। মাত্র ৩২ বলে ফিফটি, এরপর ২৩ বলে শতক এবং পরের ১৬ বলেই ১৫০ ছুঁয়ে ফেলা এই ইনিংসকে আলাদা মাত্রা দেয়। চার ও ছক্কার বৃষ্টিতে হারারের মাঠ যেন মুহূর্তের জন্য ব্যাটিং প্রদর্শনীর মঞ্চে পরিণত হয়।
ইংল্যান্ডের স্পিনার ফারহান আহমেদ ও রালফি আলবার্ট ছিলেন কার্যত অসহায়। তবে সবচেয়ে আলোচিত শট ছিল অ্যালেক্স গ্রিনের বাউন্সারে সূর্যবংশীর এক ‘ফোরহ্যান্ড স্ম্যাশ’, যা সোজা বোলারের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে সাইটস্ক্রিনে আছড়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ম্যানি লামসডেনের বলে স্লগ সুইপ করতে গিয়ে আউট হন তিনি। গ্লাভসে লেগে বল ধরা পড়ে উইকেটকিপারের হাতে।
সূর্যবংশী আউট হওয়ার পর ভারতের ইনিংস কিছুটা ধীর হলেও জেমস মিন্টো তিনটি উইকেট নেওয়া সত্ত্বেও শেষ ওভারে গিয়ে ভারত ৪০০ রানের ঐতিহাসিক সীমা ছুঁয়ে ফেলে।
রেকর্ড লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে ইংল্যান্ড। ভারত প্রথম দুই ওভারেই মেডেন দেয়। বেন ডকিন্স ও জোসেফ মুর রান তুলতে ব্যর্থ হন। আরএস অম্ব্রীশ মুরকে বোল্ড করলে চাপ আরও বাড়ে। বেন মেইস নামার পর কিছুটা গতি আসে ইনিংসে। প্রথম পাওয়ারপ্লে শেষে ইংল্যান্ডের স্কোর দাঁড়ায় ৬৪/১।
মেইস সাতটি চার ও দুটি ছক্কায় ঝড়ো রান তুললেও সূর্যবংশীর কাছ থেকে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের শীর্ষস্থান ফিরে পাওয়ার পরের বলেই আউট হন। অধিনায়ক থমাস রিউ ১৮ বলে ৩১ রান করেন, ডকিন্স করেন ৪৯ বলে ফিফটি। কিন্তু ডকিন্স আউট হতেই মাত্র ৯ বলের ব্যবধানে পড়ে যায় চারটি উইকেট। ম্যাচ তখন পুরোপুরি ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
শেষদিকে ক্যালেব ফ্যালকনার ও জেমস মিন্টো ৯২ রানের জুটি গড়ে কিছুটা লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিলেও প্রয়োজনীয় রানরেট তখন ১০-এর অনেক ওপরে। ফ্যালকনার নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম শতক পূর্ণ করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি আউট হলে ইংল্যান্ড তখনও ছিল শতাধিক রান পিছিয়ে। সেখানেই কার্যত শেষ হয়ে যায় ফাইনালের সব সম্ভাবনা।
হারারেতে এই জয়ের মধ্য দিয়ে ভারত শুধু আরেকটি শিরোপাই জিতল না, বরং সূর্যবংশীর মতো এক কিশোর প্রতিভার হাত ধরে ভবিষ্যতের জন্য নতুন স্বপ্নের জানালাও খুলে দিল।