‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…
মেলবোর্ন, ৮ ফেব্রুয়ারি: বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নাটকীয় রূপান্তরের সাক্ষী হচ্ছে দেশটি। একসময় নিষিদ্ধ ও প্রান্তিক দল হিসেবে বিবেচিত জামায়াতে ইসলামী এখন মূলধারার বিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে সমানে সমানে পাল্লা দিচ্ছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে যাওয়ায় দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব থেকে বহু ভোটার নতুন বিকল্প হিসেবে জামায়াতের দিকে ঝুঁকছেন।
ডন পত্রিকায় প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় রকমের পালাবদলের চিত্র—আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনী মাঠে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে উঠে এসেছে জামায়াত, যেখানে তরুণ ভোটারদের সমর্থন ও দুর্নীতিবিরোধী বার্তাই তাদের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সী ভাস্কর রমেশ চন্দ্র দুই দশকের বেশি সময় ধরে মূর্তি নির্মাণের কাজ করছেন। গোপালগঞ্জ-৩ আসনের এই ভোটার দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন। তবে পরিস্থিতি বদলে গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। ২০২৫ সালের ১০ মে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বর্তমানে ২০২৪ সালের আন্দোলন ঘিরে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’ ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’-এর অভিযোগে বিচার চালাচ্ছে। বিদ্রূপাত্মকভাবে, একই ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের আন্দোলনে দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এর আগে এই ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়; ২০১৫ সালে আলী আহসান মুজাহিদ ও ২০১৬ সালে মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হয়।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দলটি নতুন করে সংগঠিত হয়ে নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থান নিতে চাইছে।
একসময় নিষিদ্ধ ও সমালোচিত জামায়াত এখন মূলধারার বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে জনসমর্থনে প্রায় সমান অবস্থানে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিতে বিরক্ত ভোটারদের একটি বড় অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে। আওয়ামী লীগের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত থাকায় তারা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তবে সামাজিক মাধ্যমে নির্বাচনবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে দলটি।
ভোট প্রসঙ্গে রমেশ চন্দ্র বলেন, “আমি ভোট দেব। এবার জামায়াতকে ভোট দেব। সবাই তো সুযোগ পেয়েছে—এবার জামায়াতকে সুযোগ দেওয়া উচিত।” তাঁর দাবি, জামায়াত নেতারা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিতে জড়িত নন। তার মতো অনেক ভোটারই এখন জামায়াতের দিকে ঝুঁকছেন—যা দেশের ভোটের রাজনীতিতে বড় রকমের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাড়তে থাকা রাজনৈতিক শক্তি
ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)-এর জরিপে দেখা যায়, বিএনপির পক্ষে ৩০ শতাংশ, জামায়াতের পক্ষে ২৬ শতাংশ এবং ছাত্রদের গড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-র পক্ষে ৬ শতাংশ ভোটার সমর্থন জানিয়েছেন। জানুয়ারির মাঝামাঝি প্রজেকশন বিডি, আইআইএলডি, জাগরণ ফাউন্ডেশন ও ন্যারেটিভের যৌথ জরিপে বিএনপি ৩৪.৭ শতাংশ ও জামায়াত ৩৩.৬ শতাংশে প্রায় সমান অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তৃণমূলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের সুযোগ নিয়ে জামায়াত নিজেকে শৃঙ্খলাবদ্ধ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। চাঁদাবাজির অভিযোগ জানানোর ডিজিটাল টুল ও সরকারি ব্যয় নজরদারির উদ্যোগ ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। তরুণ ভোটারদের মধ্যেও দলটির প্রভাব বাড়ছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধিত ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ, যার মধ্যে ১৮–৩৫ বছর বয়সী প্রায় সাড়ে চার কোটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বড় জয় পায়।
জামায়াত আসন্ন নির্বাচনে এনসিপিসহ ১১ দলের জোট গঠন করেছে। আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকায় বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে আসছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, এই জোট আদর্শগত নয়, বরং সংস্কার, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিবিরোধী এজেন্ডায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে গড়া।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেছেন, দেশজুড়ে তাদের সমর্থন “অভূতপূর্ব”। প্রচারণা শুরুর পর তিনি দুই ডজনের বেশি জেলায় শতাধিক জনসভায় অংশ নিয়েছেন বলে জানান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন জামায়াতের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
সম্প্রতি দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমা অর্থনৈতিক চাপের কারণে জামায়াত শরিয়াভিত্তিক শাসন চাপিয়ে দিতে পারবে না—এমন মূল্যায়নও উঠে এসেছে। সম্ভাব্য জামায়াত-নেতৃত্বাধীন সরকারের আশঙ্কায় ভারতও উদ্বিগ্ন। দিল্লির মতে, দলটির ঐতিহাসিক পাকিস্তানঘেঁষা অবস্থান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ভারতের অনুকূলে থাকা ধারা থেকে সরিয়ে নিতে পারে।
শাসনক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, দলটি সরকার পরিচালনায় প্রস্তুত। তাঁর ভাষ্য, গত পাঁচ দশকে দক্ষ ও সৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলেছে জামায়াত। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান খান মনে করেন, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরীর মতে, অভিজ্ঞতার চেয়ে যোগ্যতা ও সততা বেশি গুরুত্বপূর্ণ; জামায়াতের দলে শিক্ষিত ও যোগ্য জনবল তুলনামূলক বেশি।
প্রথম আলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জামায়াতের ২২৪ প্রার্থীর মধ্যে ২০১ জন উচ্চশিক্ষিত, ১০ জন পিএইচডিধারী। বিএনপির ২৮৭ প্রার্থীর মধ্যে ২২৯ জন উচ্চশিক্ষিত ও ৮ জন পিএইচডিধারী।
জামায়াত নেতৃত্বের দাবি, দলটি ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র চায়, যেখানে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পরামর্শভিত্তিক শাসন থাকবে। নারীদের অধিকার খর্ব বা জোরপূর্বক পোশাকবিধি চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সংবিধান ও জাতিসংঘের মানবাধিকার মানদণ্ড মেনেই চলার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছে দলটি।
প্রান্তিক থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী
১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করায় দীর্ঘদিন বিতর্কিত ছিল। অতীতে নির্বাচনে দলটির আসনসংখ্যা সীমিত ছিল। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ায় দলটি আবার বৈধ রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির সঙ্গে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে জনঅসন্তোষ এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল জামায়াতের পক্ষে সুযোগ তৈরি করেছে।
দলটি চাঁদাবাজি প্রতিরোধে মোবাইল অ্যাপ চালুর ঘোষণাও দিয়েছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের পর বিএনপির বহু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে; দলটি হাজার হাজার সদস্যকে বহিষ্কার করেছে।
সব মিলিয়ে, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিকে নতুনভাবে সাজাবে—এটি প্রায় নিশ্চিত। একসময় দেশের প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করা একটি দলের আজ ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা—বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় রাজনৈতিক উলটপালটগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au