সাংবাদিক রেজানুরের গ্রেফতারে কিউআরএস’র উদ্বেগ
মেলবোর্ন, ২২ জুন- স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক ও দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোহাম্মদ রেজানুর ইসলামের গ্রেফতার…
মেলবোর্ন ৮ ফেব্রুয়ারি: চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন চীন তার প্রভাব আরও সুসংহত করার সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পড়ছে কঠিন পরীক্ষার মুখে।
১২ ফেব্রুয়ারির এই ভোট হবে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের শাসনের অবসানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং ঢাকার পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ উপেক্ষা করায় ক্ষুব্ধ হয়েছে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে সক্রিয় হয়েছে।
১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ শেখ হাসিনার আমলেও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। তবে তখনো ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী। বিশ্লেষকদের মতে, সেই বাস্তবতায় এখন স্পষ্ট পরিবর্তনের আভাস মিলছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সিনিয়র ফেলো জোশুয়া কার্লান্টজিক বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং ভবিষ্যতের যে কোনো সরকারই চীনের দিকে কৌশলগতভাবে ঝুঁকছে।
তার ভাষায়, বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করেছে। বেইজিং ক্রমেই আত্মবিশ্বাসী হচ্ছে যে, এই কৌশলে ঢাকা একটি প্রো-চীন ভূমিকা নেবে।
ইউনূসের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ছিল চীন, যা এই নীতিগত পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা দেয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুই দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর আওতায় ভারতের সীমান্তের কাছে প্রস্তাবিত উত্তরাঞ্চলীয় একটি বিমানঘাঁটির পাশে ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার একটি প্রায় অপরিবর্তনীয় ধারা তৈরি হয়েছে।
শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক বারবার উত্তেজনার মুখে পড়েছে। গত ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে “অবিরাম বৈরিতা”র অভিযোগ তোলে এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে।
পুলিশের হিসাবে, ২০২৫ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রায় ৭০ জন নিহত হন। তবে ঢাকা এই সহিংসতার মাত্রা নিয়ে ভারতের বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেছে।
এর মধ্যেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কিছু কূটনৈতিক উদ্যোগ দেখা গেছে। জানুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে অংশ নিতে ঢাকায় যান। বিএনপি এবারের নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকেও সমবেদনা জানান। বিএনপি জিতলে তিনিই সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
তবে সম্পর্ক আবার জটিল আকার নেয়, যখন হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর প্রতিবাদের মুখে একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে বাংলাদেশ ভারতে আয়োজিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক প্রাভীন দোনথি বলেন, দুই দেশই শেষ পর্যন্ত বাস্তববাদী অবস্থান নেবে। তার মতে, নয়াদিল্লি ও ঢাকা উভয়ই জানে, অবনতিশীল সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে উভয় পক্ষের জন্য ব্যয়বহুল হতে পারে। এই কারণেই নতুন সরকার অস্থিরতার বদলে স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেবে।
এদিকে, ঢাকা পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক জো রদার করছে। জানুয়ারিতে এক দশকের বেশি সময় পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে। যদিও পাকিস্তান ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী, তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও ঢাকা নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইবে না।
অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে পারে, বিশেষ করে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তার মতে, একসময় ভারতের সঙ্গে কঠোর অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামিও এবারের নির্বাচনী প্রচারে বাস্তববাদী বার্তা দিচ্ছে।
তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্য সত্ত্বেও ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনো অটুট রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্থিতিশীল আছে এবং শেখ হাসিনার আমলের মাত্র একটি চুক্তি, ভারতীয় টাগবোট সংক্রান্ত চুক্তি, বাতিল করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ভারতের সাবেক উপ-হাইকমিশনার ও সাবেক কূটনীতিক দিলীপ সিনহা বলেন, চীন এমনভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন করে, যা ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়, যেমন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পোশাকশিল্পের কাঁচামাল সুতা, এখনও ভারত থেকেই আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়া মানেই ভারতের সঙ্গে বৈরিতা বাড়বে, এমন বাধ্যতামূলক সমীকরণ নেই। হুমায়ুন কবিরের ভাষায়, এটি কোনো একপক্ষ বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নয়, বরং দুই সম্পর্কই একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার বাস্তবতা।
দ্য জাপান টাইমস
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au