ইতালির তেরনি শহরে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের মূর্তি। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন ১৪ ফেব্রুয়ারি: আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। চকলেট, কার্ড, ফুল আর প্রিয় মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের দিন হিসেবে আমরা এই দিনটিকে জানি। কিন্তু এই দিনের শুরুটা কোথা থেকে হলো, তা জানলে অনেকেই অবাক হবেন।
এর শিকড় ধর্মীয় ইতিহাসে, বিশেষ করে খ্রিষ্টধর্মে।
তৃতীয় শতকে রোমে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে একজন খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ছিলেন। সম্রাট ক্লডিয়াস দ্বিতীয়ের নির্দেশ অমান্য করে তিনি সম্রাটের উপাসনা করতে অস্বীকার করেন। এটিকে সাম্রাজ্যের প্রতি অবাধ্যতা হিসেবে ধরা হয়। এরই শাস্তি হিসেবে ২৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁকে শিরচ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এর প্রায় দুই শতাব্দী পর, ৪৯৬ সালে ভ্যালেন্টাইনকে খ্রিষ্টান ধর্মে সেইন্ট (সাধু) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং ১৪ ফেব্রুয়ারিকে তাঁর স্মরণদিবস বা ‘ফিস্ট ডে’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মূলত যিশু খ্রিষ্টের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ও আত্মত্যাগকে স্মরণ করার জন্যই এই দিনটি নির্ধারিত হয়েছিল।
কিন্তু একজন শহীদ সেইন্ট এর স্মরণদিবস কীভাবে প্রেম, কার্ড আর চকলেটের দিনে রূপ নিল?
সেই পরিবর্তনটা হয়েছে ধীরে ধীরে। ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুর পর একটি জনপ্রিয় কাহিনি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে বলা হয়, সম্রাটের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সৈনিকদের গোপনে বিয়ে পড়াতেন ভ্যালেন্টাইন। এই গল্পের মধ্য দিয়েই তাঁর নাম ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
চতুর্দশ শতকে ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসার তাঁর কবিতা দ্য পার্লামেন্ট অব ফাউলস-এ এক লোকবিশ্বাসের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয় ভ্যালেন্টাইনের স্মরণদিবসে পাখিরা তাদের সঙ্গী বেছে নেয়। চসার এই ধারণাটিকে মানুষের প্রেমের সঙ্গে যুক্ত করেন। এটিকেই ভালোবাসা দিবস নিয়ে লেখা প্রথম কবিতা হিসেবে ধরা হয়।
এরপর থেকেই ১৪ ফেব্রুয়ারিতে ভালোবাসার বার্তা আদান-প্রদান জনপ্রিয় হতে থাকে। সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডে প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যে ছোট উপহার বিনিময় বেশ সাধারণ হয়ে ওঠে। উনিশ শতকে বাণিজ্যিক ছাপাখানার প্রসারের ফলে কার্ড ছাপিয়ে পাঠানো সহজ হয়ে যায়। একই সময়ে ইংল্যান্ডের ক্যাডবুরি কোম্পানি ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে বিশেষ চকলেট বাজারে আনে।
বিশ শতকে এসে বিষয়টি আরও বাণিজ্যিক রূপ পায়। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটির হল ব্রাদার্স প্রিন্টার্স ভালোবাসা দিবসকে কার্ড বিক্রির বড় সুযোগ হিসেবে দেখেন। আজকের পরিচিত হলমার্ক কোম্পানিই ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যুক্ত হয়ে ওঠে।
আজ সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের ধর্মীয় পরিচয় অনেকটাই বিস্মৃত হলেও রোমান ক্যাথলিক, অ্যাংলিকান, লুথেরান ও ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চে ১৪ ফেব্রুয়ারি এখনো তাঁর স্মরণদিবস হিসেবে তালিকাভুক্ত আছে, যদিও এটি একটি তুলনামূলকভাবে ছোট ধর্মীয় দিবস।
ভালোবাসা উদযাপনের ধারণা শুধু খ্রিষ্টধর্মেই সীমাবদ্ধ নয়। ইহুদিদের রয়েছে ‘তু বি’আভ’, যাকে অনেক সময় ইহুদি ভালোবাসা দিবস বলা হয়। এটি বিয়ে ও সঙ্গী খোঁজার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রাচীন উৎসব, বিশেষ করে ইসরায়েলে জনপ্রিয়।
হিন্দুধর্মে প্রেমের দেবতা কামদেবকে ঘিরে উৎসব রয়েছে, যেখানে পরিবার, সমাজ ও মানবতার প্রতি ভালোবাসাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৌদ্ধধর্ম ও ইসলামে ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন নেই। এই দুই ধর্মেই সঙ্গী, পরিবার ও মানুষের প্রতি ভালোবাসাকে সারা বছর চর্চার ওপর জোর দেওয়া হয়।
ভালোবাসা দিবস একমাত্র ধর্মীয় দিবস নয়, যাকে সংস্কৃতি ও বাণিজ্য গ্রাস করেছে। বড় উদাহরণ বড়দিন, যেখানে উপহার, গাছ, আলো আর সান্তা ক্লজ ধর্মীয় উৎসবকে অনেকটাই ছাপিয়ে গেছে। ইস্টারও চকলেট, ডিম আর বানির উৎসবে পরিণত হয়েছে।
আরেকটি তুলনামূলক কম পরিচিত উদাহরণ হলো ৩১ অক্টোবরের অল হ্যালোজ ইভ, যা চার্চ ক্যালেন্ডারে অল সেন্টস ডে’র আগের রাত। আজ আমরা একে হ্যালোইন হিসেবেই বেশি চিনি, ট্রিক অর ট্রিটের উৎসব হিসেবে।
সেন্ট প্যাট্রিকস ডে-ও আজ অনেকের কাছে আইরিশ সংস্কৃতি উদযাপন ও পানাহারের দিনে পরিণত হয়েছে, যদিও এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আয়ারল্যান্ডে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারকারী সাধুকে স্মরণ করা।
খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারে এখনো কিছু বিশেষ দিন রয়েছে, যেগুলো বাণিজ্যিক উৎসবে পরিণত হয়নি, যেমন এপিফানি, পেন্টেকস্ট, অ্যাশ ওয়েডনেসডে ও গুড ফ্রাইডে।
ভালোবাসা দিবসের মতো এগুলোকে ঘিরে এখনো কেউ বড় করে ব্যবসার সুযোগ খুঁজে পায়নি, অন্তত এখনো পর্যন্ত।
তথ্যসূত্র: কানাডিয়ান অ্যাফেয়ার্স