বাংলাদেশ

উন্নয়ন ব্যয় সর্বনিম্ন হলেও কমেনি ঋণনির্ভরতা

ইউনূস সরকারের ১৪ মাসে ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা

  • 5:40 am - February 18, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১০৪ বার
উন্নয়ন ব্যয় সর্বনিম্ন হলেও কমেনি ঋণনির্ভরতা। ছবিঃ দ্য বিজনেস স্টান্ডার্ড

মেলবোর্ন, ১৮ ফেব্রুয়ারি- ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে দেশের মোট ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। এই সময়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় ছিল গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, তবুও ঋণের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ঋণ বুলেটিন।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উন্নয়ন ব্যয় কমানো হলেও রাজস্ব ঘাটতি, পুরোনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ এবং পরিচালন ব্যয় কমাতে ব্যর্থতার কারণে সরকারকে নতুন করে ঋণ নিতে হয়েছে।

রাজস্ব ঘাটতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক টানাপোড়েনের কারণে গত অর্থবছরে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়নি। এতে সরকারের আর্থিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং নিয়মিত ব্যয় মেটাতে ঋণনির্ভরতা বেড়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দেয়। রাজস্ব বোর্ডের ভেতরে আন্দোলন এবং অনিশ্চয়তা অর্থ সংগ্রহে প্রভাব ফেলে। ফলে উন্নয়ন ব্যয় কমানো সত্ত্বেও সরকার পরিচালনায় ঋণ ছাড়া বিকল্প ছিল না।

ঋণের ধারাবাহিক বৃদ্ধি

তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের মোট ঋণ ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৩০ জুন, আগের সরকারের পতনের আগে ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বৈদেশিক ঋণ নতুন বিনিময় হারে রূপান্তর করার ফলে অতিরিক্ত ৫৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা যোগ হয় মোট ঋণের হিসাবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে বৈদেশিক ঋণ বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে ৯ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১০ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।

এই সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণের কিস্তি ছাড়াও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়। গত অর্থবছরে সরকার ৩৪৪ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা পেয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২০০ কোটি ডলার।

উন্নয়ন ব্যয় সর্বনিম্ন

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন ছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তুলনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন ব্যয় কমলেও পুরোনো প্রকল্পের বকেয়া বিল, ভর্তুকি এবং দায় পরিশোধের চাপের কারণে ঋণের পরিমাণ কমেনি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার মূলত পুরোনো ঋণ পরিশোধ ও সুদ মেটাতেই নতুন ঋণ নিয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেকেই সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলায় সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাতিল ও স্থগিত করেও পরিচালন ব্যয় কমানো যায়নি।

নতুন সরকারের সামনে কঠিন পরীক্ষা

এদিকে নতুন সরকার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। দলটি ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে আগামী ১০০ দিনের মধ্যেই তাদের নতুন বাজেট ঘোষণা করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, প্রথম বাজেটই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ করতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, কৃষিঋণ মওকুফ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের মতো পদক্ষেপ নিতে হলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন বেতন কাঠামোর এক-তৃতীয়াংশ বাস্তবায়ন করলেও অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে সরকারকেও আবার ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও কমে যেতে পারে, যা বর্তমানে ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

মাহবুব আহমেদ বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, নতুন সরকারকে ঋণ পরিশোধ সূচি বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। প্রায়ই দেখা যায়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে প্রাথমিক প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়। সংশোধিত বাজেট পুনর্মূল্যায়ন করে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে হবে।

তিনি আরও বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া যেসব ঋণ পুনরায় দরকষাকষির সুযোগ আছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এতে ঋণ পরিশোধের চাপ কিছুটা লাঘব হতে পারে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে ঋণ কমানো সম্ভব হয়নি, কারণ কাঠামোগত সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো, ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে আগামী অর্থবছরেও ঋণের চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট তাই কেবল অর্থনৈতিক নথি নয়, বরং জনআস্থার পরীক্ষাও হয়ে উঠবে।

সূত্রঃ দ্য বিজনেস স্টান্ডার্ড

এই শাখার আরও খবর

মহানবীকে কটূক্তির অভিযোগে হিন্দু যুবক গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে শ্যামল গাইন (২০) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার…

মুম্বাইয়ে সালমানের সঙ্গে নয়নতারার মিশন শুরু

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- বলিউডে নতুন চমক নিয়ে হাজির হচ্ছেন দুই ভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় তারকা-সালমান খান ও দক্ষিণ ভারতের ‘লেডি সুপারস্টার’ নয়নতারা। মুম্বাইয়ে শুরু হয়েছে তাদের…

শিশুসহ কারাগারে যাওয়া যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগমের জামিন মঞ্জুর

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল-  রাজধানীতে আলোচিত ঘটনার পর দেড় মাসের শিশুসহ কারাগারে যাওয়া যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগম অবশেষে জামিন পেয়েছেন। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাত…

ট্রাইব্যুনালে ঘুষকাণ্ডে প্রসিকিউটর সাইমুমের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলেছে

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য সাবেক প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে আলোচিত ঘুষকাণ্ডে প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি হত্যা মামলা…

ইরান কেন বাংলাদেশি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল-  মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে ইরান, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলে। ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরের…

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ: আইএমএফ

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী চলতি বছরে মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে ভারতের তুলনায় এগিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। যদিও সামগ্রিক অর্থনীতির আকারে ভারত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au