আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…
মেলবোর্ন, ২ মার্চ- ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে যে হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, সেটি প্রচলিত কৌশলের বাইরে গিয়ে দিনের আলোতেই চালানো হয়। সাধারণত এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা গভীর রাতে পরিচালিত হয়, যখন নজরদারি ও প্রতিরক্ষা তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে। কিন্তু এবার ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। কারণ, হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গোয়েন্দা তথ্য হাতে পায়, যা তাদের মতে সুযোগ হাতছাড়া না করার মতো ছিল।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকালে তেহরানের মধ্যাঞ্চলের একটি সুরক্ষিত কম্পাউন্ডে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। শুধু তিনি নন, একই সময়ে সেখানে ইরানের আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা বৈঠকে যোগ দেবেন বলেও তথ্য পাওয়া যায়। বহু মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এমন একটি মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল, যখন শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তি একই স্থানে একত্র হবেন।
খামেনির দৈনন্দিন রুটিন, চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারি চালানো হচ্ছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। কীভাবে এ নজরদারি পরিচালিত হয়েছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইঙ্গিত দেন যে উন্নত গোয়েন্দা সক্ষমতা ও নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে খামেনির অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তথ্যের উৎস সরাসরি মানব গোয়েন্দা নাও হতে পারে। বরং খামেনির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ওপর প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, যোগাযোগ ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ এবং নিরাপত্তা বলয়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করা হয়েছিল। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ থেকে ব্যক্তির দৈনন্দিন অভ্যাস ও চলাচলের একটি ধারা তৈরি হয়, যা ভবিষ্যৎ অবস্থান অনুমান করতে সহায়ক হয়।
গত বছরের জুনে ১২ দিনের সংঘাতে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। সে সময় ইরানের টেলিযোগাযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশের অভিযোগ ওঠে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দেহরক্ষীদের গতিবিধিও নজরদারির আওতায় ছিল বলে দাবি করা হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে সংগৃহীত তথ্য পরবর্তী পরিকল্পনায় ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তেহরান বরাবরই জানত যে তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব শত্রুপক্ষের নজরদারির আওতায় রয়েছে। তারপরও এত গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যর্থতা ইরানের প্রতিরক্ষা ও পাল্টা গোয়েন্দা ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরছে বলে বিশ্লেষকদের মত। আবার অনেকে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নিয়মিতভাবে তাদের নজরদারি কৌশল পরিবর্তন করে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে প্রচলিত নিরাপত্তা পদ্ধতি দিয়ে তা ঠেকানো কঠিন।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এ অভিযানের মূল গোয়েন্দা তথ্য আসে সিআইএ থেকে। সেই তথ্য ইসরায়েলের কাছে পাঠানো হয় এবং যৌথভাবে অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। দায়িত্ব বণ্টনও ছিল স্পষ্ট। ইসরায়েল মূলত রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলার দায়িত্ব নেয়, আর যুক্তরাষ্ট্র মনোযোগ দেয় সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানার দিকে।
স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো তেহরানের আকাশে পৌঁছে কম্পাউন্ডে একের পর এক প্রায় ৩০টি বোমা নিক্ষেপ করে। ধারণা করা হচ্ছে, খামেনি তখন কম্পাউন্ডের ভেতরে একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে অবস্থান করছিলেন। লক্ষ্যবস্তুটি যথেষ্ট গভীরে থাকায় নির্ভুল আঘাত হানতে একাধিক শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করা হয়।
হামলার সময় তেহরানের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানা হয়। এর মধ্যে ছিল প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কার্যালয়। পরে তিনি এক বিবৃতিতে জানান, তিনি নিরাপদ আছেন। তবে ইরান নিশ্চিত করেছে যে তিনজন জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তারা হলেন ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিব আলি শামখানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ এবং আইআরজিসি কমান্ডার জেনারেল মুহাম্মদ পাকপৌর।
হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় সময় ছিল মধ্যরাত। ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে অবস্থানরত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন বলে জানা গেছে। খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এমন পরিস্থিতির জন্য পুরোপুরি অপ্রস্তুত ছিল না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীর্ষ নেতা বা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কেউ নিহত হলে কে দায়িত্ব নেবেন, সে পরিকল্পনা আগেই প্রস্তুত ছিল। ফলে এই হত্যাকাণ্ড ইরানের ক্ষমতার কাঠামোতে তাৎক্ষণিক শূন্যতা তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনই স্পষ্ট নয়।
এই হামলা শুধু একটি লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড নয়, বরং বৃহত্তর সামরিক অভিযানের সূচনাবিন্দু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। এখন নজর রয়েছে, ইরান কী ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নেয় এবং এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়।
সূত্রঃ বিসিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au