আংশিক খুলছে কাতারের আকাশপথ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাংকারে লাখো ইসরায়েলি
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কাতার সীমিত পরিসরে তাদের আকাশপথ আবার খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।…
মেলবোর্ন ৭ মার্চ: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত এখন শুধু একটি আঞ্চলিক সামরিক সংকট নয়; এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। এই সংঘাতের ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো—বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েত—তাদের কৌশলগত অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও যুদ্ধের সিদ্ধান্ত বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
গত কয়েক দিনে দুবাই ও আবুধাবি বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রায় প্রতিটি বাণিজ্যিক বিমানকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান নিরাপত্তা দিয়ে আকাশে তুলেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেও ইউএই (UAE) মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে যেন আন্তর্জাতিক পরিবহন ও ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় থাকে।
হাজার হাজার আটকে পড়া যাত্রীকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো এবং বিশ্বকে এই বার্তা দেওয়া—যে দেশটি এখনো একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য ট্রানজিট হাব—এই দুই লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করছে আমিরাত সরকার।
“আমাদের অঞ্চলকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে টেনে নেওয়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? কে আপনাকে অনুমতি দিয়েছে আমাদের অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে?”
এই উদ্দেশ্যে তারা ইরানের সঙ্গে নেপথ্যে যোগাযোগ করে একটি নিরাপদ আকাশপথ করিডোর তৈরি করেছে, যাতে বিমানগুলো উপসাগরের সংঘাতপূর্ণ আকাশসীমা এড়িয়ে দক্ষিণ দিক দিয়ে চলাচল করতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সফল অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন, আর্থিক খাত এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
এই সাফল্য সহজে আসেনি। নিরাপদ জীবনযাপন, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ এবং বহুজাতিক কোম্পানির জন্য স্থিতিশীল অবকাঠামো—এই সব কিছুর ওপর ভিত্তি করেই ইউএই তার আন্তর্জাতিক সুনাম গড়ে তুলেছে।
কিন্তু চলমান যুদ্ধ সেই সুনামকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই শুধু যাত্রীদের নিরাপত্তা নয়, বরং দেশের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষা করাও এখন তাদের বড় অগ্রাধিকার।
এই পরিস্থিতি বজায় রাখতে গিয়ে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। গত এক সপ্তাহে ইউএইকে ইরানের ছোড়া এক হাজারেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে হয়েছে।
সমস্যা হলো, ইরান তুলনামূলকভাবে সস্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অনেক ড্রোনের দাম কয়েক হাজার ডলার মাত্র। কিন্তু এগুলো প্রতিহত করতে যে আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়, তার প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের খরচ কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
এই অসম ব্যয়ের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে গালফ রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর বড় চাপ পড়তে পারে।
গালফ অঞ্চলের অনেক দেশ তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাস্তবে তারা রাশিয়া, চীন ও অন্যান্য দেশের প্রযুক্তিও ব্যবহার করে থাকে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করা একটি বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ একদিকে রাজনৈতিক জোট, অন্যদিকে বৈশ্বিক অস্ত্রবাজারের প্রতিযোগিতা—দুই দিক থেকেই চাপ তৈরি হতে পারে।
এই বাস্তবতায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও নতুন সুযোগ দেখছেন। তিনি কাতার ও ইউএই নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত অপেক্ষাকৃত সস্তা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ড্রোন সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছেন।
এই বিশ্লেষণে পরিষ্কার বুঝা যায় একটি আঞ্চলিক সংঘাত কীভাবে সামনে দিনগুলোতে বৈশ্বিক অস্ত্র ও কৌশলগত বাজারকে পুনর্গঠন করতে যাচ্ছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সম্পদ জব্দ করার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। যদি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে তা তেহরানের অর্থনীতির জন্য বড় আঘাত হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে ইউএই ইরানি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনায় এই নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এই আর্থিক পথ বন্ধ হয়ে গেলে ইরানের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, যুদ্ধের বাড়তি ব্যয় মেটাতে গালফ রাষ্ট্রগুলো তাদের বিশাল বিদেশি বিনিয়োগ পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং কাতার বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার্বভৌম সম্পদ তহবিল পরিচালনা করে। তারা গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু যুদ্ধের খরচ বাড়তে থাকলে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা হতে পারে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগ বাজারেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনে নানা ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কৌশলগত বার্তার মধ্যেও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এই সংঘাত থেকে সরে যেতে পারে, কিন্তু অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার দায় গালফ রাষ্ট্রগুলোকেই বহন করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই কম। তবে এই সংঘাত ইতিমধ্যেই নতুন রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী খালাফ আহমদ আল হাবতুর প্রকাশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেছেন:
“আমাদের অঞ্চলকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে টেনে নেওয়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? কে আপনাকে অনুমতি দিয়েছে আমাদের অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে?”
তিনি আরও জানতে চান, এই যুদ্ধ কি ট্রাম্পের নিজস্ব সিদ্ধান্ত, নাকি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চাপের ফল।
তার বক্তব্য থেকে বুঝা যায় গালফ রাষ্ট্রগুলো এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে, যার সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি, কিন্তু যার প্রভাব তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত কতটা বিস্তৃত হবে তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘর্ষ নয়; এটি বৈশ্বিক কৌশলগত সম্পর্কগুলোকেও নতুনভাবে পুনর্গঠন করছে।
রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ—সব বড় শক্তিরই এই অঞ্চলে কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। ফলে এই সংঘাত ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পের যুদ্ধ সিদ্ধান্ত শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়; এটি উপসাগরীয় অঞ্চল ও বিশ্বের বাকি অংশের মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কগুলোকে নতুনভাবে আঁকছে।
লেখক:
লরা টিঙ্গল
গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স এডিটর, এবিসি নিউজ (অস্ট্রেলিয়া)
OTN Bangla- সম্পাদকীয় ডেস্ক
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au