হট্টগোলের মধ্যে সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ, প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধী দলের ওয়াকআউট। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১২ মার্চ- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে হট্টগোল ও প্রতিবাদের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ দিয়েছেন। ভাষণ শুরুর সময় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্যরা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে প্রতিবাদ জানান এবং পরে তারা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অধিবেশন শুরু হলে নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা নিজেদের আসন থেকে দাঁড়িয়ে হাতে প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেন। প্ল্যাকার্ডে ‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’ এবং ‘জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বন্ধ কর’সহ বিভিন্ন স্লোগান লেখা ছিল। এ সময় সংসদ কক্ষে হট্টগোল শুরু হয়। স্পিকার সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানালেও বিরোধী সদস্যরা তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন।
হট্টগোলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি সংসদ কক্ষে প্রবেশ করে স্পিকারের পাশে আসন গ্রহণ করেন। তখনও বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এ অবস্থাতেই রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্য শুরু করেন। বক্তব্য চলাকালে একপর্যায়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করে ওয়াকআউট করেন।
এর আগে দিনের শুরুতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা হিসেবে বক্তব্য দেন তারেক রহমান। সংসদে এটিই ছিল তার প্রথম বক্তব্য। তিনি অধিবেশনের সভাপতিত্ব করার জন্য বিএনপির জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন। পরে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী তার প্রস্তাব গৃহীত হলে খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন।
এর আগে সংসদে স্পিকার পদে নির্বাচিত হন ভোলা–৩ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন নেত্রকোনা–১ আসনের সংসদ সদস্য কায়সার কামাল। খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে সংসদে তাদের নির্বাচন সম্পন্ন হয়। পরে সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করান।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সংসদের অধিবেশন কিছু সময়ের জন্য মুলতবি করা হয়। বিরতির সময় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির কক্ষে তাদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বিরতি শেষে বেলা পৌনে একটার দিকে নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন পুনরায় শুরু হয়।
তবে অধিবেশন শুরু হওয়ার পর সংসদের মাইকে প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেওয়ায় কিছু সময় কার্যক্রম পরিচালনার পর স্পিকার প্রায় বিশ মিনিটের জন্য সভা মুলতবি ঘোষণা করেন। পরে অধিবেশন পুনরায় শুরু হলে রাষ্ট্রপতির ভাষণের অংশ শুরু হয়।
অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, অতীতে একটি ফ্যাসিস্ট সরকার জাতীয় সংসদকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে অকার্যকর করে রেখেছিল। তিনি বলেন, নতুন সংসদের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি বদলাতে চায় সরকার। তার মতে, জাতীয় সংসদকে যুক্তি, বিতর্ক ও জাতীয় সমস্যার সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ থেকে দেশে আবারও কাঙ্ক্ষিত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। একটি সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সব রাজনৈতিক দল ও জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তাবেদারমুক্ত ও ফ্যাসিবাদমুক্ত একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সবার লক্ষ্য এক হওয়া উচিত।
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করার জন্য প্রবীণ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত আগে থেকেও রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানও সংসদের একজন প্রবীণ সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশকে প্রথম বৈঠকের সভাপতিত্ব করার জন্য প্রস্তাব করেছিলেন।
নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদ হবে দেশের সব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার অঙ্গীকার নিয়ে সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই নীতিকেই সামনে রেখে সংসদ পরিচালিত হবে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের পথ কখনো সহজ ছিল না এবং বিভিন্ন সময়ে স্বৈরশাসনের মুখোমুখি হতে হয়েছে দেশকে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে ছাত্র, জনতা, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ওই আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ করে স্পিকার আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিমসহ সব শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে মনে করেন। দেশের জনগণ এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রম দেখার জন্য আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
স্পিকার আরও বলেন, গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনব্যবস্থা হলেও সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বিত উদ্যোগেই জাতীয় স্বার্থ রক্ষা সম্ভব। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিরোধী দল সংসদে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে এবং সে ক্ষেত্রে তিনি নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি জানান, স্পিকারের দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ইতোমধ্যে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।