জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ: বিএনএন এশিয়া
মেলবোর্ন, ১৩ মার্চ- ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশা ও সংবাদমাধ্যমের পরিবেশ ছিল উত্তেজনাপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থা বিএনএন এশিয়া এক প্রতিবেদনে এমন মূল্যায়ন তুলে ধরেছে।
এশিয়াজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাটি তাদের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ের প্রতিবেদনে জানায়, এই সময়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের ঝুঁকি, চাপ ও সহিংসতার মুখে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকদের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, সিরিয়া, শ্রীলঙ্কা, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, নেপাল, জাপান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, চীন, উত্তর কোরিয়া এবং কম্বোডিয়াসহ মোট ২০টি দেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা স্থানীয় সাংবাদিক ও অংশীদার সংগঠনের সহযোগিতায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, আইনি হয়রানি ও অন্যান্য নির্যাতনের ঘটনা নথিবদ্ধ করে থাকে। পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা সাংবাদিকদের জরুরি সহায়তা প্রদান এবং সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক তৈরির কাজও করে থাকে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এ সময় অনেক সাংবাদিক শারীরিক হামলা, আইনি চাপ এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির মুখে পড়েন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠে কাজ করা সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি এবং ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানির ঘটনাও সামনে আসে।
প্রতিবেদনে ২৭ জানুয়ারি নরসিংদীতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বিশেষ উল্লেখ করা হয়েছে। ওই দিন ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ এর একটি অনুষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং এতে অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ঘটনা সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো ওই ঘটনাকে ‘মব ভায়োলেন্স’ হিসেবে উল্লেখ করে এবং কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার বিষয়টি তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের ঘটনা সাংবাদিকদের পেশাগত ঝুঁকি কতটা বাস্তব ও গুরুতর তা স্পষ্ট করে দেয়।
ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনী সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারকে কেন্দ্র করে প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনাও সামনে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা গণহামলা ও অনলাইন হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে কিছু ঘটনা রাজনৈতিক প্রচারণা ও নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে এখনো অনেক সাংবাদিক বিভিন্ন মামলায় আটক রয়েছেন। সংবাদমাধ্যম সংশ্লিষ্ট অনেকেই এসব মামলাকে ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ অভিযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের ঘটনাকে ঘিরে দায়ের করা কিছু হত্যা মামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে এডিটরস কাউন্সিল বাংলাদেশ নবনির্বাচিত সরকারের কাছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা এসব মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। সংগঠনটির মতে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করছে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে অন্তত ৩০ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের দীর্ঘ সময় ধরে আটক থাকতে হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এ ধরনের ঘটনা সংবাদমাধ্যমের ওপর একটি ভীতিকর বার্তা পাঠায় এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশকে সংকুচিত করে।
এদিকে ফেব্রুয়ারির শুরুতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এক প্রতিবেদনে জানায়, গত ১৮ মাসে দেশে অন্তত ১৮৯ জন সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন। একই সময়ে ২৯টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন এসেছে। এসব ঘটনার পেছনে আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক চাপকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গণমাধ্যম খাতে এ ধরনের পরিবর্তনের ফলে সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে এসব প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগও উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও অংশীদারিত্বে পরিবর্তনের ফলে ‘অদৃশ্য’ বা অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রভাব বাড়ছে বলেও পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে। এতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আর্টিকেল নাইনটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত জাতীয় মিডিয়া কমিশন এবং ব্রডকাস্টিং কমিশন সংক্রান্ত খসড়া অধ্যাদেশের সমালোচনা করেছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে প্রকাশিত এই খসড়াগুলোর ওপর মতামত দেওয়ার জন্য মাত্র তিন দিনের সময় দেওয়া হয়, যা অনেক পর্যবেক্ষকের মতে তড়িঘড়ি এবং ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া।
সমালোচকদের মতে, প্রস্তাবিত আইনে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের সুরক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচনের পর গঠিত সরকার সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাস্তবে অনেক সাংবাদিক এখনো বিভিন্ন ধরনের হুমকি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভয়ের পরিবেশের মধ্যে কাজ করছেন।