মালয়েশিয়ায় আটকে ইরানের নারী ফুটবলাররা, নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৩ মার্চ- মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত ইরানের নারী ফুটবল দলের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা শেষ মুহূর্তের চেষ্টা চালাচ্ছেন, যাতে দলের বাকি সদস্যদের আবার অস্ট্রেলিয়ায় ফিরিয়ে আনা যায়। তাদের আশঙ্কা, খেলোয়াড়দের ইরানে ফেরত পাঠানো হলে তারা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
দলের কয়েকজন সদস্যকে আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খেলোয়াড়দের একটি দল মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে পৌঁছায়। তবে মালয়েশিয়া জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনের সদস্য নয়। ফলে দেশটিতে অবস্থানকালে এসব খেলোয়াড়ের আইনি সুরক্ষা ও অধিকার খুবই সীমিত।
মানবাধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন, কুয়ালালামপুরে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকে খেলোয়াড়দের একটি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাদের তুরস্কে পাঠানো হতে পারে এবং পরে সীমান্ত পেরিয়ে ইরানে ফেরত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে দলের সাত সদস্যকে অস্ট্রেলিয়ায় সুরক্ষা ভিসা দেওয়া হয়। গোল্ড কোস্টে অনুষ্ঠিত এক ম্যাচের আগে খেলোয়াড়রা ইরানের জাতীয় সংগীত গাইতে অস্বীকৃতি জানান। এই ঘটনাকে অনেকেই ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ হিসেবে দেখেন।
তবে বুধবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অস্ট্রেলিয়ায় থাকা ওই সাতজনের মধ্যে একজন খেলোয়াড় সিদ্ধান্ত বদলে ইরানের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
কুয়ালালামপুরে খেলোয়াড়রা পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন ইরানি মানবাধিকারকর্মী রাহা। ২০২২ সালে মাহসা জিনা আমিনির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ‘উইমেন লাইফ ফ্রিডম’ আন্দোলনের পর তিনি নিজেও ইরান ছেড়ে মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেন। নিরাপত্তার কারণে নিজের পুরো নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি।
রাহা জানান, খেলোয়াড়রা যখন হোটেলের দিকে যাচ্ছিলেন তখন তিনি তাদের একজনের সঙ্গে কথা বলেন। সেই খেলোয়াড় তাকে বলেন, তাদের দেশে ফিরে যেতে বলা হয়েছে এবং তারা পরিবারের কাছে ফিরতে চান। খেলোয়াড়টির দাবি, ইরানে ফিরে গেলে তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না, বরং সম্মান জানানো হবে।
তবে রাহা এই আশ্বাসকে মিথ্যা বলে মনে করেন। তার দাবি, আন্তর্জাতিক মঞ্চে সরকারবিরোধী কোনো অবস্থান নেওয়া খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ইরানে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইতিহাস রয়েছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে ২০১২ সালে সরকারবিরোধী সমালোচনার পর আটক অবস্থায় মারা যাওয়া ব্লগার সাত্তার বেহেশতি এবং ২০১৮ সালে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া কুস্তিগীর নাভিদ আফকারির ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।
রাহা বলেন, এসব কথা বলার পর এক খেলোয়াড়ের চোখে পানি চলে আসে। তিনি বলেন, খেলোয়াড়রা ভীষণ চাপের মধ্যে ছিলেন। ওই খেলোয়াড় তাকে জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদ জানান, তবে বলেন পরিবারের কাছে ফিরতেই হবে।
রাহার দাবি, খেলোয়াড়রা বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়া ছাড়ার আগে বাস থেকে তারা মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে ও এসওএস সংকেত দিয়ে সাহায্যের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলেও তিনি জানান। তার অভিযোগ, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত মানবাধিকারকর্মীদের ওপরও নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং তাদের ভিডিও ধারণ করে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
ইরানি-অস্ট্রেলীয় মানবাধিকারকর্মী জারা ফাখরোদিন জানান, তিনি কয়েকজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তবে পরে আর কোনো উত্তর পাননি। তার ধারণা, ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কর্মকর্তারা খেলোয়াড়দের ফোন জব্দ করে থাকতে পারেন।
তার মতে, কিছু খেলোয়াড়কে দেশে ফেরার জন্য প্রলোভনও দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে যারা প্রথমে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে পরে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তিনি বলেন, ইরানে থাকা খেলোয়াড়দের পরিবারের সদস্যদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে। সম্পদ জব্দ করা কিংবা পরিবারের কাউকে আটক করার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
ব্রিসবেনভিত্তিক আরেক কর্মী হাদি কারিমি বলেন, মালয়েশিয়ায় থাকা তার এক সূত্র জানিয়েছে যে খেলোয়াড়দের ঘিরে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট ছিল।
সিডনিভিত্তিক মানবাধিকারকর্মী হালেহ নাজারি বলেন, ইরানে ফিরে গেলে খেলোয়াড়রা বাস্তব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। তার মতে, ইরানের সরকার দেশের ভেতর ও বিদেশে থাকা নাগরিকদের নিয়মিত হুমকি দিয়ে থাকে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
তিনি বলেন, তবু আশা ছেড়ে দেওয়া হয়নি। মালয়েশিয়ায় থাকা ইরানিরা এখনো খেলোয়াড়দের নিরাপদ রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মালয়েশিয়াভিত্তিক ইরানি নাগরিক মোহাম্মদ আবুতালেবি, যিনি রাহাদের সঙ্গে মিলে খেলোয়াড়দের ইরানে ফেরত পাঠানো ঠেকাতে কাজ করছেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এসে খেলোয়াড়দের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেলে পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে পারে।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড পুলিশ দলটির সঙ্গে থাকা এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। অভিযোগ রয়েছে, গোল্ড কোস্টে এক নারীকে হুমকি দিয়েছেন তিনি। ওই কর্মকর্তা মোহাম্মদ সালারি নামে পরিচিত এবং তাকে খেলোয়াড়দের তদারকির জন্য সরকারনিযুক্ত প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অভিযোগকারী নারী ঘটনাটি সরাসরি কুইন্সল্যান্ডের প্রিমিয়ার ডেভিড ক্রিসাফুল্লিকে জানান। পরে বিষয়টি পুলিশের কাছে পাঠানো হয়।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক এর আগে জানিয়েছিলেন, পুরো প্রতিনিধিদলের সবাইকে সুরক্ষা ভিসা দেওয়া হয়নি।
এই সংকটের মধ্যেই ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, দেশটি ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নেবে না। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো আয়োজিত এই আসরে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য চলমান সংঘাতকে দায়ী করা হয়েছে।
ক্রীড়ামন্ত্রী আহমদ দোনিয়ামালি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তার অভিযোগ, গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে ইরানের বহু মানুষ নিহত হয়েছে।
উল্লেখ্য, ইরান ইতোমধ্যে বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল এবং গ্রুপ পর্বের কয়েকটি ম্যাচ লস অ্যাঞ্জেলেস ও সিয়াটলে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে দেশটি টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ