যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের সুপ্রিম লিডার মুজতবা খামেনি ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ১৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ঘিরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই চান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক, তবে কী শর্তে তা শেষ হবে—এ নিয়ে বড় শক্তিগুলোর অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল—এই তিন পক্ষের লক্ষ্য, কৌশল ও প্রত্যাশা বিশ্লেষণ করলে সেই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর অবস্থান এই যুদ্ধে কিছুটা পরিবর্তনশীল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কখনো তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার কথা বলছেন, আবার কখনো তেহরানের ওপর কঠোর শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এমনকি ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়েও তার বক্তব্যে দোদুল্যমানতা দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দৃষ্টিতে আদর্শ পরিস্থিতি হতে পারে—ইরানে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা, যা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি নয়। তবে এখন পর্যন্ত সেই লক্ষ্যের কোনো স্পষ্ট অগ্রগতি দেখা যায়নি।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই চাপ বাড়ছে। তেলের দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালি-তে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি এবং ব্যয়বহুল সামরিক সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।
অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে আগ্রহী হলেও তা নিজেদের শর্তে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সব দাবি মেনে নিতে রাজি নয়। ইরানের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ’ একটি বড় উপাদান।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি-এর নেতৃত্বে তেহরান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—চাপের মুখে নতি স্বীকার নয়। দেশটির দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব ইরানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রেখেছে।
ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে, যুদ্ধ বন্ধের জন্য তাদের ওপর ভবিষ্যতে আর হামলা হবে না—এমন নিশ্চয়তা এবং ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ প্রয়োজন। যদিও বাস্তবে এই দাবিগুলো পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তবে ইরানের ইসলামি নেতৃত্ব ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস যদি এই সংঘাতে টিকে থাকতে পারে, তাহলে সেটিকেই তারা নিজেদের জন্য কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইবে।
যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইসরায়েল-এর অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। দেশটি ইরানের সামরিক সক্ষমতা, বিশেষ করে ব্যালিস্টিক মিসাইল ভাণ্ডার, ড্রোন প্রযুক্তি এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর নেতৃত্বাধীন সরকার ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছে। তাই তারা চায়, ইরান যেন বুঝতে পারে—এই সক্ষমতা পুনর্গঠন করলে ভবিষ্যতেও বড় মূল্য দিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো—বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমান—এই সংঘাত নিয়ে বাড়তি উদ্বেগে রয়েছে।
তারা সরাসরি যুদ্ধকে সমর্থন না করলেও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে পড়ছে। এতে করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে।
সব পক্ষের লক্ষ্য ও কৌশল ভিন্ন হওয়ায় এই যুদ্ধের দ্রুত সমাধান এখনো অনিশ্চিত। একদিকে সামরিক চাপ, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুত্রঃ বিবিসি