জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন দিয়ে ভিডিও পোস্ট
মেলবোর্ন, ২৮ মার্চ- শরীয়তপুরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাতে দুর্বৃত্তরা এই আগুন লাগায় বলে জানা গেছে।…
মেলবোর্ন, ২৭ মার্চ- বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৯ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এই গুণী শিল্পী।
তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশের সংগীতাঙ্গনসহ সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, ভক্ত ও অনুরাগীরা গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার গাওয়া কালজয়ী গান স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানান।
মাহবুবা রহমানের সংগীতজীবন শুরু হয়েছিল অত্যন্ত অল্প বয়সেই। ১৯৪৭ সালে তৎকালীন ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রথম তার কণ্ঠে গান প্রচারিত হয়। সেই সময় থেকেই তিনি ধীরে ধীরে শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে সত্তরের দশক পর্যন্ত রেডিও এবং চলচ্চিত্রে অসংখ্য জনপ্রিয় গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম শীর্ষ কণ্ঠশিল্পী।
তার কণ্ঠে পল্লিগীতি ও আধুনিক গান বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। গ্রামবাংলার মাটির গন্ধমাখা সুর এবং হৃদয়ছোঁয়া আবেগময় পরিবেশনায় তিনি নিজেকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যান। সংগীতজ্ঞরা মনে করেন, তার কণ্ঠে ছিল স্বতন্ত্র এক আবেগ, যা শ্রোতাদের গভীরভাবে স্পর্শ করত।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতেও তার অবদান অনস্বীকার্য। দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এ সমর দাস-এর সুরে তার গাওয়া ‘মনের বনে দোলা লাগে’ গানটি আজও শ্রোতাদের কাছে অমলিন। এই গানটি তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয় এবং চলচ্চিত্র সংগীতে তার অবস্থান সুদৃঢ় করে।
এরপর জহির রায়হান পরিচালিত চলচ্চিত্র কখনো আসেনি-তে খান আতাউর রহমান-এর সুরে গাওয়া ‘নিরালা রাতের প্রথম প্রহরে’ এবং ‘তোমাকে ভালোবেসে অবশেষে কী পেলাম’ গান দুটি তাকে কিংবদন্তির আসনে অধিষ্ঠিত করে। এই গানগুলো আজও বাংলা সংগীতের অনন্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
শুধু তাই নয়, তিনি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’, ‘আসিয়া’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘সোনার কাজল’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ এবং ‘সাত ভাই চম্পা’র মতো বহু কালজয়ী চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠ দিয়েছেন। তার কণ্ঠে এসব গানে ফুটে উঠেছে প্রেম, বেদনা, দেশপ্রেম এবং জীবনের নানা অনুভূতি।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন। এই স্বীকৃতি তার দীর্ঘ সংগীতজীবনের প্রতি জাতির সম্মান ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।
ব্যক্তিজীবনেও ছিল নানা উত্থান-পতন। ১৯৫০ সালে তিনি আবুল হাসনাতের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে পারিবারিক অমতে হওয়া সেই বিয়ে স্থায়ী হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে তিনি প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সংগীতজ্ঞ খান আতাউর রহমান-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির ঘরে এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী রুমানা ইসলাম মায়ের সংগীতধারাকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
সহকর্মীরা জানান, মাহবুবা রহমান শুধু একজন শিল্পীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উৎসাহ দেওয়া, সংগীতচর্চায় উদ্বুদ্ধ করা এবং শিল্পের প্রতি নিবেদিত থাকার শিক্ষা দেওয়ায় তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশ্লেষকদের মতে, মাহবুবা রহমানের কণ্ঠে যে সময়ের গানগুলো সৃষ্টি হয়েছে, তা বাংলা সংগীতের স্বর্ণযুগের অংশ। তার গানগুলো আজও বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও তার কণ্ঠের আবেদন অমলিন রয়েছে।
তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের সংগীতজগৎ এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে। একজন শিল্পী হিসেবে তিনি যেমন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনি তার গানগুলো দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।
শিল্পীর পরিবার, সহকর্মী ও ভক্তদের কাছে তিনি শুধু একজন গায়ক নন, বরং একটি স্মৃতি, একটি সময় এবং একটি আবেগের নাম। তার গাওয়া গানগুলোই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au