বাংলাদেশ

আলোচিত শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের মৃত্যু: সংগ্রাম ও শিক্ষাদানের এক দীর্ঘ পথচলার অবসান

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার থেকে পুনর্বাসন—শেষ পর্যন্ত স্ট্রোকে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে থেমে গেল এক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের জীবন

  • 11:47 am - April 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৯৯ বার
হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল, মুন্সীগঞ্জের বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন,৬ এপ্রিল: মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের আলোচিত বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল আর নেই। শনিবার (৪ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রাতেই গ্রামের বাড়ি সিরাজদিখানের নিমতলা শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।

হৃদয় মণ্ডলের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়—এটি সাম্প্রতিক সময়ের এক বহুল আলোচিত অধ্যায়েরও সমাপ্তি। ২০২২ সালের মার্চে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তার গ্রেফতার দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে শিক্ষা ও মানবাধিকার মহলে তার পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনা হয়।

কীভাবে শুরু হয় সেই ঘটনা?

২২ মার্চ ২০২২—সেই দিনটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় শিক্ষার্থীরা তাকে ধর্ম ও বিজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন করে। এর জবাবে তিনি বিজ্ঞান ও ধর্মের পার্থক্য ব্যাখ্যা করেন, যা ছিল একটি একাডেমিক আলোচনার অংশ।

কিন্তু সেই আলোচনার একটি অংশ গোপনে ভিডিও করে কিছু শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে গেলে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং বিষয়টি স্কুল কমিটির নজরে আসে।

সেই স্কুলের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক এবং ছাত্রদের কথাবার্তা গোপনে ভিডিও করে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। সেকারণে তারা ঘটনাটিকে পূর্বপরিকল্পিত বলে মনে করেন।

স্কুলটির প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, দশম শ্রেণির ক্লাসে ছাত্র শিক্ষকের প্রশ্ন উত্তরের ঘটনা ঘটে ২০শে মার্চ। কিন্তু তার পরদিন ১০/১২ জন ছাত্র এসে তার কাছে বিজ্ঞান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ করে।

মি: আহমেদ উল্লেখ করেন, ছাত্রদের অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি ঐ শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ার পাশাপাশি সাময়িকভাবে বরখাস্তও করেন। এরপরও ২২শে মার্চ ঐ শিক্ষকের বাড়িতে আক্রমণ করা হয়।

একই বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী (ইলেকট্রিশিয়ান) আসাদ মিয়া বাদী হয়ে ২২ মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় দণ্ডবিধির ২৯৫ ও ২৯৫(এ) ধারায় মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ ছিল ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন মহল থেকে তার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়।

জামিন না পাওয়া ও আইনি প্রশ্ন

গ্রেফতারের পর ২৩ ও ২৮ মার্চ তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। এতে আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে—শ্রেণিকক্ষের একটি একাডেমিক আলোচনা নিয়ে এ ধরনের ব্যবস্থা কতটা যুক্তিসঙ্গত।

এছাড়া, এ ধরনের মামলায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ার বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়। হৃদয় মণ্ডলের মুক্তির দাবিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন Amnesty International এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তির আহ্বান জানায়।

পরিবারের দুর্দশা

জামিন পাওয়ার পর তার এবং পরিবারের সবার নিরাপত্তা চেয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তার স্ত্রী ববিতা হাওলাদার। ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

তার স্ত্রী ববিতা হাওলাদার সেই সময় পরিবারের কঠিন বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন,
“মিথ্যা মামলায় আমার স্বামীকে কারাগারে রাখা হয়েছিল। প্রতিটি দিন যেন একেকটি বছরের মতো মনে হয়েছে। আমার সন্তানরা তাদের বাবার জন্য সারাক্ষণ কাঁদত।” তিনি পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণও করেন।

জামিন, অব্যাহতি ও ফিরে আসা

অবশেষে ১০ এপ্রিল আদালত তাকে জামিন দেন এবং সেদিন বিকেলেই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। মোট ১৯ দিন কারাগারে ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে শিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেন এবং একই বছরের ১৬ আগস্ট মুন্সীগঞ্জ আমলি আদালত-১ এর বিচারক জশিতা ইসলাম তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন।

পেশাগত জীবনে হৃদয় মণ্ডল ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি বিজ্ঞান ও গণিত পড়িয়েছেন। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন সহজ-সরল, দায়িত্বশীল এবং আন্তরিক একজন মানুষ।

তার স্ত্রী ববিতা হালদার জানান, দীর্ঘদিন ধরে কানের সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসার জন্য ভারতে দুই দফায় প্রায় দেড় মাস অবস্থান করেন এবং ডান কানে দুবার অস্ত্রোপচার হয়।

২৮ মার্চ দেশে ফিরে ২৯ মার্চ আবার কর্মস্থলে যোগ দেন এবং স্বাভাবিকভাবে ক্লাসও নেন। কিন্তু সেই রাতেই হঠাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন। প্রথমে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, পরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হয়।

৩১ মার্চ তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ৪ এপ্রিল বিকেলে তিনি মারা যান।

হৃদয় মণ্ডলের মৃত্যুতে স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকেই তাকে একজন শিক্ষক হিসেবে স্মরণ করছেন—যিনি প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের পেশার প্রতি অটল ছিলেন।

তার জীবন যেন এক দ্বৈত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—একদিকে দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা, অন্যদিকে একটি আলোচিত অধ্যায়। সবশেষে তিনি থেকে গেলেন একজন শিক্ষক হিসেবেই, যার জীবন ও মৃত্যু সমাজে শিক্ষা, আইন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

এই শাখার আরও খবর

গণপতি পরিবারের ছয়-সাত ভরি স্বর্ণ গেল কোথায়? উদ্ধার সম্ভব নয় কেন বলছে পুলিশ?

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, হত্যার…

ডেঙ্গুতে ৪২ হাজারের বেশি আক্রান্ত, মৃত্যু ১১৭

বাংলাদেশে চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৪২ হাজার ৫৯০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে…

সুন্দরবন ও বাঘ সংরক্ষণে বাংলাদেশ-ভারতের পরবর্তী বৈঠক বাংলাদেশে

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগার রক্ষায় বাংলাদেশ ও ভারত বিদ্যমান সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় পরবর্তী বৈঠকগুলো বাংলাদেশে আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তসীমান্ত…

ভয়াল সেই ভোররাতে ছোট বোনকে ফোন করেছিলেন গণপতির স্ত্রী, রিসিভ না করলেও ২ দিন খোঁজ নেয়নি পূজা

রংপুরের মাছুয়াপাড়া এলাকার একই পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারেন নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ছোট বোন এবং শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর শ্যালিকা পূজা…

ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের উপস্থিতি কেন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্রিকস সম্মেলন ২০২৬। গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।…

পাবনায় বিএনপি নেতাকে গুলি, মৃত্যু নিশ্চিত করতে কুপিয়ে হত্যা

পাবনার আটঘরিয়ায় আদম আলী (৬০) নামে এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে এবং পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au