পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ল ৯১ লাখ নাম। ছবিঃ আনন্দবাজার
মেলবোর্ন, ৭ এপ্রিল- ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যাচাই-বাছাই শেষে মোট প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার গভীর রাতে নির্বাচন কমিশন জেলা ভিত্তিক বাদ পড়া ভোটারদের তালিকা প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, বিবেচনাধীন ছিলেন মোট ৬০ লাখ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটার। তাদের মধ্যে ২৭ লাখ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনের নাম চূড়ান্তভাবে বাদ পড়েছে। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রথম চূড়ান্ত তালিকায় বাদ পড়েছিল আরও ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫২ জনের নাম। সব মিলিয়ে মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯০ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪৫।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিবেচনাধীন তালিকার প্রায় সব ভোটারের তথ্য যাচাই করে প্রকাশ করা হলেও এখনো ২২ হাজার ১৬৩ জন ভোটারের তথ্য চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এসব তথ্য ই-স্বাক্ষর সম্পন্ন হলে বাদ পড়া তালিকায় আরও কিছু নাম যুক্ত হতে পারে।
জেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে মুর্শিদাবাদ জেলায়, যেখানে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৩৭ জন ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরেই রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা, যেখানে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬৬৬ জনের নাম বাদ পড়েছে। মালদহ জেলাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক, প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার ৩৭৫ জন ভোটারের নাম তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।
দীর্ঘ যাচাই-বাছাই এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে সোমবার রাত ১২টার পর ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত যাদের নাম তালিকায় রয়েছে, তারাই এবারের নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। নতুন করে আর কোনো ভোটার যুক্ত হওয়ার সুযোগ আপাতত নেই, তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী নির্দেশনার ওপর।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিবেচনাধীন ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির মনোনীত বিচারকেরা এসব তথ্য যাচাই করে ‘যোগ্য’ ও ‘অযোগ্য’ ভোটার নির্ধারণ করেন। যাচাইয়ে উত্তীর্ণদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, আর যাদের অযোগ্য বিবেচনা করা হয়েছে, তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
ভোটার তালিকা থেকে এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়াকে কেন্দ্র করে শুরু থেকেই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাজ্যের শাসক দল ত্রিণমূল কংগ্রেস এবিষয়ে সরব অবস্থান নেয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যাণার্জিও নিজেও বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত হয়ে মতামত তুলে ধরেন। আদালতের একাধিক শুনানিতে নির্দেশ দেওয়া হয়, যেসব ভোটারের নাম বাদ পড়বে, তারা আপিল করার সুযোগ পাবেন।
এই নির্দেশনার ভিত্তিতে গঠন করা হয় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, যেখানে বাদ পড়া ভোটাররা অনলাইন ও অফলাইন উভয় পদ্ধতিতে আবেদন করতে পারেন। ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বে রয়েছেন সাবেক বিচারপতিরা। তারা আবেদনকারীদের তথ্য পুনরায় যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে কয়েকজনের নাম আবার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে এখনো স্পষ্ট নয়, বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে কতজন ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন বা কতজনের আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। জানা গেছে, বিবেচনাধীন তালিকার কয়েক লাখ ভোটারের নাম শেষ পর্যন্ত বাদ পড়েছে, যদিও পুরো সংখ্যাটি নিয়ে এখনো কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন আরও জানিয়েছে, গত ৩০ মার্চের পর নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য যে আবেদন করা হয়েছে, তা এবারের নির্বাচনের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। তবে বিবেচনাধীন তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের জন্য ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে শেষ সুযোগ রাখা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনাল যদি কাউকে যোগ্য ঘোষণা করে, তবে সোমবার রাত ১২টার আগ পর্যন্ত তার নাম তালিকায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল। এখন সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যারা এখনো ট্রাইব্যুনালে আবেদন করবেন বা যাদের আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে, তারা এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কি না। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, সেই সুযোগ নেই। তবে সুপ্রিম কোর্ট যদি নতুন করে কোনো নির্দেশনা দেয়, তাহলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান তালিকাই কার্যত এবারের নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। এতে পূর্বের তালিকাভুক্ত ভোটারদের পাশাপাশি যাচাইয়ে উত্তীর্ণ নতুন আবেদনকারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগীয় যাচাইয়ে উত্তীর্ণ বিবেচনাধীন ভোটাররাও এতে স্থান পেয়েছেন।
সবশেষে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়া নতুন কিছু নয়। প্রতি নির্বাচনের আগে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিনের পরই ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ করা হয়। এবারও একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে, এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
সূত্রঃ আনন্দবাজার