মাধবী রানী বাঁশফোঁড়। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৮ এপ্রিল- নাম তার মাধবী রানী বাঁশফোঁড়। বাংলাদেশে পিছিয়ে পড়া হরিজন সম্প্রদায়ের মেয়ে। তবুও মাধবী চেয়েছিল- মানবসেবা দিয়ে সমাজে সুগন্ধ ছড়াবে। ঠিক মাধবীলতা ফুলের মতো। তাই ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন বুনতে থাকে সে। নার্সিংয়ের মতো মহান পেশায় যোগ দিয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করবে। কিন্তু মাধবীর এই স্বপ্নে বাধা হয়েছে- সরকারের একটি নিয়ম। সেই নিয়মের প্যাঁচে আটকে গেছে মাধবী বাঁশফোঁড়, আটকে গেছে তার স্বপ্নও।
মাধবীদের বাড়ি পাবনা জেলার আমিনপুর উপজেলার কাশিনাথপুরে। দারিদ্র্যের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করা তার পরিবারের বসবাস একখানা দোচালা ঘর। তাও আবার সরকারি খাসজমিতে। সেই ঘরেই থাকে হরিজন সম্প্রদায়ের বাঁশফোঁড় গোত্রের মেয়ে মাধবী রানী। তার বাবার নাম সন্তোষ কুমার বাঁশফোঁড়। তিনি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। মাসে পাঁচশো টাকার সরকারি ভাতা ছাড়া তার আর কিছু নেই, কোনো আয় নেই! হাত নেই, পা নেই এমন নয়- কিন্তু ভাগ্যের কাছে সে বহু আগেই পরাজিত।
ডলি রানী, মাধবীর মা- প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে হাটবাজার পরিষ্কার করেন। কিন্তু তার জন্য নেই কোনো মাসিক বেতন। বাজারের দোকানগুলো থেকে তোলা হিসেবে চাল-ডাল-তরকারি যা পান, তাই দিয়ে সংসার চলে। বাড়তি হিসেবে রাস্তা-ঘাটে-বাজারে মরা কুকুর, বিড়াল টেনে সরিয়ে দিলে দু’টো পয়সা বাড়তি পান।
যে পরিবারের জমি নেই, নেই বসতভিটা। সাধারণ মানুষের মতো অতীত নেই, নেই ভবিষ্যৎও- আছে শুধু বেঁচে থাকার দৈনন্দিন যুদ্ধ। এমন যুদ্ধের মাঝেই নিজের স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়েছে মাধবী রানী। তবে অভাব তাকে ভাঙতে পারেনি। লাঞ্ছনা তাকে থামাতে পারেনি। বইখাতা কিনতে না পারলেও পড়া থামায়নি সে।
কারণ সে জানত- একদিন নার্স হবে। একদিন সাদা পোশাক পরে মানুষের পাশে দাঁড়াবে, যেভাবে কেউ কখনো তার পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি। মাধবীর ভেতরে অদম্য সাহস আর স্বপ্ন দেখে সাহায্যের হাত প্রসারিত করেন কাশিনাথপুরের একজন চিকিৎসক। নাম ডা. শামীম হুসাইন। তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মাধবী সফলতার সাথে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে। এই বছর সে বিএসসি নার্সিং ভর্তি পরীক্ষায় বসে। ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায় তার অবস্থান- ১১ হাজার ৮২০তম।
লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীর ভিড়ে, বই কিনতে না পারা হরিজন সম্প্রদায়ের একটি মেয়ের এমন ফলাফল অবশ্যই অসাধারণ। কিন্তু সে ভর্তি হতে পারেনি। তার তুলনায় ফলাফলে পিছিয়ে থাকার পরও পশ্চাৎপদ জাতিগোষ্ঠীর কোটায় যশোর সরকারি নার্সিং কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যান বিপীন চাকমা। মেধাতালিকায় যার অবস্থান ১১ হাজার ৮৮১তম।
অথচ মাধবী রানী তার চেয়ে ৬১ ধাপ এগিয়ে ছিল। তবুও সে বাদ। কেন? কারণ বিপীন চাকমা যে সম্প্রদায়ের মানুষ, সেই সম্প্রদায় সরকারি গেজেটভুক্ত। কিন্তু মাধবী রানীর বাঁশফোঁড় গোত্রের নাম- সরকারি কাগজে নেই!
তাই পাবনা জেলা প্রশাসন জানিয়ে দেয়, গেজেটে নাম নেই বলে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া যাবে না। প্রত্যয়নপত্র নেই, তাই কোটায় আবেদন করা যায়নি। কোটায় আবেদন নেই, তাই ভর্তি হওয়া যাচ্ছে না। একটা কাগজ! অথচ সেই কাগজই একটা মেয়ের সারাজীবনের স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে!
নগর-জনপদের ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে সুন্দর ঝকঝকে রাখে যে সম্প্রদায়, তাদের নামেই নেই সরকারের গেজেটে। অথচ দেশে বাঁশফোঁড় সম্প্রদায়ের মানুষ কম করে হলেও পাঁচ লাখ।
মাধবী রানী বাঁশফোঁড় ওটিএন বাংলাকে বলেন, ‘আমি এখন একা। শুধু সরকার নয়, কেউ আমার পাশে নেই। বাবা প্রতিবন্ধী বাবা, মা সংসারের ঘানি টানতে টানতে ক্লান্ত। আর আমার স্বপ্ন? তা শেষ হওয়া পথে।’
যদিও পাবনা জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘মাধবী রানী আসলে বৈষম্যের শিকার। আইন পরিবর্তন করা উচিৎ। এতে তার মতো পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়ের মেধাবীরা সুযোগ পাবে।’
তবে রাষ্ট্রের এমন বৈষম্যের পরও মাধবীর স্বপ্ন পূরণের সুযোগ আছে। যদিও বেসরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউশনে ভর্তি এবং পড়া চালিয়ে যাওয়ার খরচ অনেক। এ জন্য আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছে তার পরিবার।
তার মা ডলি রানী বাঁশফোঁড় ওটিএন বাংলাকে বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি আমার মেয়েটির পাশে দাঁড়াতো, তাহলে তার স্বপ্ন পূরণ হতো। সমাজের মানুষের সেবা করার সুযোগ পেত মাধবী।’