লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেছে ইরান
মেলবোর্ন, ৯ এপ্রিল- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান পুনরায় হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বন্ধ করেছে। ইরানের আধা সরকারি বার্তা…
মেলবোর্ন, ৮ এপ্রিল- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে উভয় পক্ষই। একদিকে ইরান দাবি করছে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ অর্জন করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে তাদের সামরিক ও কূটনৈতিক চাপই এই সমঝোতা নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি এটিকে বড় সাফল্য বলছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখনো বহাল রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদ বুধবার এক বিবৃতিতে জানায়, যুদ্ধের প্রায় সব লক্ষ্য অর্জিত হওয়ায় তারা এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তাদের দাবি, পরিকল্পিত আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ১০ দফা প্রস্তাবের মূল কাঠামো মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা, বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান।
ইরান আরও জানিয়েছে, এসব প্রস্তাবের বিস্তারিত চূড়ান্ত করতে আগামী শুক্রবার ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হবে। তবে তারা স্পষ্ট করেছে, এই আলোচনা যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠার একটি ধাপ।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতিকে ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সাফল্যেরই ফল। তার দাবি, চীন ইরানকে আলোচনায় বসতে রাজি করাতে ভূমিকা রেখেছে এবং ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম বিশেষ করে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টি এখন কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকবে।
ট্রাম্প আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির জন্য একটি শক্তিশালী রূপরেখা তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, “আমাদের কাছে ১৫ দফা প্রস্তাব রয়েছে, যার অধিকাংশ বিষয়েই সম্মতি পাওয়া গেছে।” যদিও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে কিনা তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে, তবুও তিনি এটিকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
হোয়াইট হাউসও একই সুরে কথা বলছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, শুরু থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন ধারণা করেছিল যুদ্ধটি চার থেকে ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। তবে মাত্র ৩৮ দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রধান সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা অতিক্রম করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। তার মতে, মার্কিন সামরিক চাপই শেষ পর্যন্ত ইরানকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে এবং সেখান থেকেই কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে।
এদিকে এই যুদ্ধবিরতিকে ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ইসরায়েলে। দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ একে ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তোলেন। তার ভাষায়, জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ইসরায়েল আলোচনার টেবিলেই ছিল না, যা নজিরবিহীন।
লাপিদ আরও বলেন, ইসরায়েলের সেনাবাহিনী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে এবং সাধারণ মানুষও কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য দেখিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সরকার ব্যর্থ হয়েছে এবং নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই অর্জিত হয়নি।
অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমেনি। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় বুধবার ভোরে আটজন নিহত এবং আরও ২২ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনায় একাধিক হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশও দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এটি স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। বরং এটি একটি কৌশলগত বিরতি, যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের অর্জনকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ইসলামাবাদে আসন্ন আলোচনা এবং সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ওপরই নির্ভর করছে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতিকে ঘিরে উভয় পক্ষের ‘বিজয় দাবি’ আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে নতুন এক জটিল বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে সামরিক সাফল্য, রাজনৈতিক চাপ এবং কূটনৈতিক আলোচনার ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের পথ।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au