শেরপুর-৩ আসনেও বড় ব্যবধানে জিতলেন বিএনপি প্রার্থী
মেলবোর্ন, ১০ এপ্রিল- শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাতে শেরপুর জেলা…
মেলবোর্ন, ৯ এপ্রিল- মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি যখন সামান্য স্বস্তির আশা জাগিয়েছিল, ঠিক সেই সময় লেবাননে ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান পুরো পরিস্থিতিকে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে যুদ্ধবিরতির কূটনৈতিক অগ্রগতি, অন্যদিকে বোমা ও ধ্বংসস্তূপে ঢেকে যাওয়া শহর—এই দ্বৈত বাস্তবতায় আজ শোকাহত লেবানন, বিভ্রান্ত আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ক্রমশ ঝুঁকির মুখে পড়ে যাওয়া একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনাই বাড়াচ্ছে না, বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার ভবিষ্যৎকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। কারণ যুদ্ধবিরতির এই সংবেদনশীল সময়ে যে কোনো বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ পুরো সমঝোতাকে ভেঙে দিতে পারে।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে বুধবার বিকেলে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর যে দৃশ্য তৈরি হয়েছে, তা এক কথায় ভয়াবহ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি বহুতল ভবনের নিচ থেকে উদ্ধারকর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা খুঁজে অবশেষে একজন নারীকে জীবিত উদ্ধার করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু তিনি একা নন—এমন শত শত আহত মানুষ এখন বিভিন্ন হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছেন।

লেবাননে ইসরাইলের বিমান হামলা। ফাইল ছবি
এই হামলাগুলো এমন এক সময় শুরু হয়, যখন লেবাননের সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির আওতায় তারাও কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। কিন্তু স্থানীয় সময় বুধবার দুপুর ২টার পরপরই শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলা সেই আশা ভেঙে দেয়। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হামলা অব্যাহত থাকে এবং বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আসলে যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে কী ছিল এবং কী ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের দেওয়া দুটি আলাদা প্রস্তাব ছিল, যার একটি বাতিল করা হয়েছে এবং অন্যটি গ্রহণ করা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প , ছবিঃ সংগৃহীত
তবে বাস্তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের পক্ষ থেকে একটি ১০ দফা প্রস্তাবই ছিল, যেটির ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন।
ট্রাম্প নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, বেশিরভাগ বিরোধপূর্ণ বিষয় সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং আলোচনার মাধ্যমে বাকি বিষয়গুলো মীমাংসা করা সম্ভব। কিন্তু মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অবস্থান বদলে গিয়ে বলা হচ্ছে, এটি আসলে চুক্তির অংশ ছিল না।
মূল বিতর্কটি এখন একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে—লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান কি এই যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়ে, নাকি এটি এর বাইরে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বলছে, লেবাননের বিষয়টি এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়। একই কথা বলেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইসরায়েলও নিজেদের বক্তব্যে একই কথা উল্লেখ করেছে।
এই অবস্থানই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ ইরান ও তার মিত্ররা মনে করছে, লেবাননে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল কার্যত যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে।
এই উত্তেজনারই প্রতিফলন দেখা গেছে হিজবুল্লাহর প্রতিক্রিয়ায়। ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার ভোরে উত্তর ইসরায়েল লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ। সশস্ত্র এই গোষ্ঠীটি এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ বলেছে, ‘আমাদের দেশ ও জনগণের ওপর ইসরায়েলি-মার্কিন আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই পাল্টা জবাব অব্যাহত থাকবে।’
এর আগে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, লেবানন থেকে ছোড়া একটি রকেট আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, লেবানন থেকে ছোড়া একটি রকেট তারা আকাশেই প্রতিহত করেছে। তবে এই পাল্টাপাল্টি হামলা যে পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করছে, তা স্পষ্ট।
আন্তর্জাতিক মহলেও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে লেবাননে ইসরায়েলি হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে দামেস্ক।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সরাসরি বলেছেন, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়া ‘অযৌক্তিক’। তার অভিযোগ, ইসরায়েল ইতিমধ্যে যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন শর্ত চাপিয়ে চুক্তির চেতনাকে দুর্বল করছে।
পারমাণবিক ইস্যুটি এই পুরো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু ইরান বলছে, তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অধিকার রাখে এবং এটি তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত।
এই বিরোধই এখন আলোচনার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। সামনে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যে আলোচনা হওয়ার কথা, সেটিও এখন প্রশ্নের মুখে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের ভেতরেও এই যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। সাবেক আইনপ্রণেতা আইনবার বেজিক বলেছেন, ৪০ দিনের যুদ্ধের পরও ইসরায়েল তার কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তার মতে, এই যুদ্ধে শুধু প্রাণহানি ও ধ্বংস বেড়েছে, কিন্তু কৌশলগত কোনো সাফল্য আসেনি।
একই ধরনের সমালোচনা করেছেন রাম বেন-বারাক। তিনি বলেন, ইসরায়েলের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির নিয়ন্ত্রণ এখন অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে গেছে এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কার্যত সেই নীতির অনুসারী হয়ে পড়েছেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ইয়োসি শাইনও বলেছেন, এই যুদ্ধে ইসরায়েল মূল খেলোয়াড় নয়, বরং একটি গৌণ শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তার মতে, ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংঘাত ইসরায়েলকে শক্তিশালী করেনি।

নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প। ছবিঃ সংগৃহীত
বিশ্বজুড়েও এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বাড়ছে। নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেছে, যেখানে তারা ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করো’ এবং ‘লেবাননে বোমা হামলা বন্ধ করো’—এমন স্লোগান দিয়েছে। একইভাবে লন্ডনে ইসরায়েলি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ হয়েছে।
এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালি। সম্ভাব্য মাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকি এড়াতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী নতুন নৌপথ নির্ধারণ করেছে।
ইরানি সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ-তে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, যেসব জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রম করতে চায়, তাদের আইআরজিসি নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নির্দিষ্ট রুট অনুসরণ করতে হবে।
ঘোষিত নতুন রুটগুলো হলো:
প্রবেশ পথ: ওমান সাগর থেকে লারাক দ্বীপের উত্তর দিক দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করতে হবে।
বহির্গমন পথ: পারস্য উপসাগর থেকে লারাক দ্বীপের দক্ষিণ দিক দিয়ে ওমান সাগরের দিকে যাত্রা করতে হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মূলত সমুদ্রে মাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকি এড়াতেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে সিরিয়া এই প্রতিক্রিয়া জানায়।
বিবৃতিতে সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং লেবাননের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো পূর্ণ বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
লেবাননের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে সিরিয়া বলেছে, তারা এই সংকটে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ দেশটির পাশে আছে। পাশাপাশি ইসরায়েলি আগ্রাসন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের ‘দায়িত্ব পালনের’ জোরালো তাগিদ দিয়েছে দামেস্ক।
সবকিছু মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি একটি জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। একদিকে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শান্তির সম্ভাবনা, অন্যদিকে লেবাননে চলমান হামলা সেই সম্ভাবনাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au