বাংলাদেশ

দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি

যুদ্ধের বাঁক বদলের পর জ্বালানি সংকট কিভাবে মোকাবেলা করবে বাংলাদেশ

  • 2:41 pm - April 09, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৫২ বার
জ্বালানি সংকটে দেশজুড়ে অস্থিরতা, বাড়ছে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৯ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। তবে দেশের জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই স্বস্তি সীমিত সময়ের জন্য এবং চলমান সংকট কাটতে এখনও মাস দুই লাগতে পারে।

বাংলাদেশের সরকার ইতিমধ্যেই দুই মাসের জন্য উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই অঞ্চলে আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানিতে বাধা পড়ায় দেশে এলএনজি ও ডিজেলের সরবরাহ কমেছে, যার ফলে বাজারে মূল্য বৃদ্ধির চাপ বেড়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা কি

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ম অনুযায়ী মাসে একবার সমন্বয় করা হয়। যুদ্ধবিরতি এবং বিশ্ববাজারের স্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে মূল্য সমন্বয় করা হতে পারে। এপ্রিল মাসে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম আগের পর্যায়ে রাখা হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলা ও হরমুজ প্রণালিতে বাধার কারণে আন্তর্জাতিক নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এতে প্রিমিয়াম ও ফ্রেট রেটে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

ব্যাহত হতে পারে এলএনজি ও তেলের সরবরাহ

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে এটি স্থায়ী না হলে অনিশ্চয়তা থেকে যাবে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বেশ কয়েকটি এলএনজিবাহী জাহাজ দেশে আসতে পারেনি। এর ফলে সরকারকে খোলা বাজার থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি সংগ্রহ করতে হয়েছে।

পেট্রোবাংলা। ছবিঃ সংগৃহীত

তিনি জানান, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় যেসব সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল, সেগুলো পুনরায় চালু করতে সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। যদিও এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আভাস দেখা যাচ্ছে, তবুও বড় উদ্বেগ রয়েছে মূল্য নিয়ে। চুক্তিভিত্তিক এলএনজির মূল্য নির্ধারিত হয় পূর্বনির্ধারিত সময়ের গড় দামের ওপর, যা বাজারের বর্তমান দরের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। এই কারণে মে ও জুন মাসে এখনও উচ্চমূল্যের চাপ বজায় থাকবে।

হরমুজ প্রণালির বন্ধে দেশে আসেনি জাহাজ

সৌদি আরবের এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল বোঝাই জাহাজ ২ মার্চ হরমুজ প্রণালিতে আটকে যায়। একইভাবে আরব আমিরাত থেকেও একটি জাহাজ আসেনি। বিপাকে পড়ে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা করে, তবে এখন পর্যন্ত তা পুরোপুরি কাজে আসেনি। তবে, ভারতের সঙ্গে ডিজেল আমদানি কিছুটা বেড়েছে।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, আগের চুক্তি অনুযায়ী এপ্রিলে ১৭টি জাহাজ আসার কথা ছিল, যার মধ্যে ৭টি নিশ্চিত হয়েছে। তবে সব জাহাজ না এলে বাংলাদেশ বিপাকে পড়তে পারে। বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান, যুদ্ধবিরতিতে জ্বালানি খাতে স্বস্তি আশা করা যায়, তবে কতটা স্বস্তি হবে তা আরও কয়েকদিনের মধ্যে বোঝা যাবে।

এলসি ও জামানতের জটিলতা

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সরাসরি ক্রয় ছাড়া ২০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এলসি খোলা এবং পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দেয়ার জটিলতায় পুরো প্রক্রিয়া স্থবির রয়েছে।

মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহে ৯টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৯ লাখ ৮৫ হাজার টন তেল কিনতে অনুমোদন দেওয়া হলেও এলসি এখনও খোলা হয়নি। এতে সরবরাহ বিলম্বিত হচ্ছে। এলসি খোলার আগে সরবরাহকারীদের ৫ শতাংশ পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দিতে হয়। ৯টির মধ্যে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান আংশিক জামানত জমা দিয়েছে, যা শর্ত অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়।

সরকার স্পট মার্কেট থেকে আরও সাত লাখ টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দিয়েছে, কিন্তু জামানতের অভাবে তা কার্যকর হয়নি। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহ সক্ষমতাও কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ।

পাম্পে তেল নিতে দুর্ভোগ

রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং যানজটের চিত্র সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠেছে। চালকরা কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও কিলোমিটার লাইন পার হওয়ার পর তেল পায়। ফলে সড়ক চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে।

জ্বালানি সংকটে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন- ছবি: কামরুল ইসলাম রুবাইয়াৎ (The Daily Star)

রাজবাড়ী, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, ফেনী, ফরিদপুর ও মুন্সীগঞ্জে তেলের সরবরাহ সংকটে কৃষক, পরিবহন চালক এবং ব্যবসায়ীদের জীবনে তীব্র প্রভাব পড়েছে। অনেক জায়গায় বাজারে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় দোকান বন্ধ রাখা হয়েছে, আবার কোথাও পুলিশের উপস্থিতিতে তেল বিতরণ করতে দেখা গেছে।

সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে এলপিজি সিলিন্ডারের অতিরিক্ত দামের অভিযোগের পর সব পরিবেশককে নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করার নির্দেশ দিয়েছে। এলপিজি বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার সরবরাহ করা হচ্ছে। ২ এপ্রিল বাজারে এলপিজির দাম প্রতি কেজিতে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা বেড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম হয়েছে ১,৭২৮ টাকা।

সরকারী উদ্যোগ ও বিকল্প উৎস

জ্বালানি মন্ত্রণালয় ৩ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাজাখস্তান ও ওমান থেকে আরও ১৭ লাখ টন তেল আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কাজাখস্তান থেকে প্রথম পর্যায়ে এক লাখ টন ডিজেল আমদানি অনুমোদিত হয়েছে।

বাংলাদেশের মোট বার্ষিক তেলের চাহিদা ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন। এর মধ্যে ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত অবস্থায় আসে সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশ থেকে।

বিপিসি এপ্রিল মাসে ৩ লাখ ২৩ হাজার টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মে মাসে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন ডিজেল ও জুনে ২ লাখ ৭০ হাজার টন ডিজেল আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিপিসি জানিয়েছে, দেশের তেলের কোনো সংকট আপাতত নেই। চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং বিকল্প উৎস থেকে তেল আসছে এবং আসবে। সেচ মৌসুম শেষ হলে ডিজেলের চাহিদা কমে আসবে, আর নতুন জাহাজ ও পাইপলাইন সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে সংকটের আশঙ্কা কমবে।

জ্বালানির দাম কমেছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতির খবরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দাম কমেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪.৮০ ডলারে নেমেছে। এশিয়া ও ইউরোপের পুঁজিবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহ স্থিতিশীল হলে বাজারে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।

যুদ্ধের এক মাসে দেশে ১১টি জাহাজে ৩ লাখ ২৭ হাজার টনের বেশি জ্বালানি এসেছে। ভারত থেকে পাইপলাইনে ২২ হাজার টন ডিজেল এসেছে। নির্ধারিত জাহাজ না আসায় সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তবে বিকল্প উৎস থেকে তেল আসা শুরু হয়েছে।

বিপিসি ও সরকারের পক্ষ থেকে বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহ জোরদার করা হয়েছে। এসব উৎস থেকে তেল আসা শুরু হলে দেশে মজুত বৃদ্ধি পাবে এবং সরবরাহ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছেন, দেশের তেলের কোনো সংকট আপাতত নেই। চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং বিকল্প উৎস থেকে তেল আসছে এবং আসবে, ফলে সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ নেই।

এই পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতি বাংলাদেশে তেলের বাজারে স্বস্তি এনেছে, তবে চ্যালেঞ্জ এখনও রয়েছে। এলসি ও জামানতের জটিলতা, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণগুলো পুরোপুরি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসা কঠিন।

বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে আমদানি বাড়িয়ে, সরবরাহ শৃঙ্খলা ঠিক রেখে এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই শাখার আরও খবর

শেরপুর-৩ আসনেও বড় ব্যবধানে জিতলেন বিএনপি প্রার্থী

মেলবোর্ন, ১০ এপ্রিল- শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাতে শেরপুর জেলা…

এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ৯১ লাখ ভোটারের ৬৩ শতাংশই হিন্দু

মেলবোর্ন, ১০ এপ্রিল- পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম বা এসআইআর প্রক্রিয়া শেষে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। তবে এই বিপুল সংখ্যক…

উপনির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়ী বিএনপির রেজাউল করিম বাদশা

মেলবোর্ন, ১০ এপ্রিল- বগুড়া-৬ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলটির জেলা সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাতের…

ব্রিসবেনে পুলিশের ধাওয়া থেকে পালাতে গিয়ে যেভাবে ধরা পড়ল কিশোর চোর

মেলবোর্ন, ৯ এপ্রিল- অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে পুলিশের ধাওয়া থেকে পালাতে গিয়ে এক কিশোর চোরের ঘটনা নাটকীয় ও বেদনাদায়ক পরিণতি নিয়েছে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে গিয়ে সে…

ফের বিতর্কে সিডনির বিতর্কিত বক্তা হাদ্দাদ: ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বক্তব্যে সমালোচনা

মেলবোর্ন, ৯ এপ্রিল- অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক বিতর্কিত ধর্মীয় বক্তা ওয়িসাম হাদ্দাদ আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। গত বছর দেশটির ফেডারেল কোর্ট তার বিরুদ্ধে বর্ণবৈষম্য আইন লঙ্ঘনের…

লেবানন ইস্যুতে মুখোমুখি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, যুদ্ধবিরতির পরও হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা

মেলবোর্ন, ৯ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা কাটেনি। একই সঙ্গে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au