সংসদে বাদ পড়ছে কার্যকারিতা হারাল গণভোটসহ ১৩ অধ্যাদেশ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ এপ্রিল- অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা গণভোট অধ্যাদেশসহ মোট ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন বা বাতিল—কোনোটিই না হওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারিয়েছে। এর ফলে গণভোটসহ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। তবে এসব অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম বৈঠকে উপস্থাপন করতে হয় এবং এরপর নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে তা অনুমোদন করতে হয় অথবা প্রয়োজনে রহিতকরণ বিল পাস করতে হয়। অন্যথায় অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। সেই নিয়ম অনুসারেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ১৩টি অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই ঝুলে থাকে এবং শুক্রবার ছিল এগুলোর অনুমোদনের শেষ দিন।
কিন্তু শেষ সময়ের মধ্যেও এসব অধ্যাদেশ অনুমোদন বা বাতিলের জন্য সংসদে কোনো বিল উত্থাপন করা হয়নি। ফলে গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন গঠনসংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ১৩টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল গণভোট অধ্যাদেশ, যা জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত প্রস্তাব বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে জারি করা হয়েছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন, অর্থাৎ গত ১২ ফেব্রুয়ারি এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয় বলে ঘোষণা করা হয়। তবে এ গণভোটের আইনি ভিত্তি নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দাবি করে আসছিল, সংসদ না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন, কিন্তু সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি আদেশ জারি করার সুযোগ নেই। এ প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ নিয়েও তীব্র সমালোচনা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকেও এই আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। গত ৩১ মার্চ সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই আদেশকে ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ ও ‘জাতীয় প্রতারণা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই আদেশের কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং এটি শুরু থেকেই অবৈধ।
অন্যদিকে, বিরোধী জোটের কিছু অংশ দাবি করে আসছিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থনের ভিত্তিতেই এই গণভোট আয়োজন করা হয়েছে, ফলে এর বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ নয়।
এদিকে, গণভোট অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোর ফলে ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল এবং এর ওপর ভিত্তি করে নেওয়া ভবিষ্যৎ পদক্ষেপগুলো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও তার কার্যক্রম নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধে প্রণীত অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধনী অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার সংশোধনী অধ্যাদেশ, আয়কর ও কাস্টমস সংশোধনী অধ্যাদেশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী অধ্যাদেশও কার্যকারিতা হারিয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে প্রশাসনিক ও আইনি কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ কমিশন গঠনসংক্রান্ত অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে বিশেষ কমিটি সংশোধিত আকারে পাস করার সুপারিশ করলেও শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো বিল সংসদে তোলা হয়নি। ফলে এই অধ্যাদেশটিও বাতিল হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, একই দিনে সংসদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং সংসদ সচিবালয়সংক্রান্ত মোট সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা মোট ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে।
তবে বাকি ১১৩টি অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন পেয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মোট ৯১টি বিল পাস করা হয়েছে, যার মাধ্যমে আইনগত কাঠামোকে স্থায়ী রূপ দেওয়া হয়েছে।
শেষ দিনে পাস হয়েছে ২৪ বিল
অধ্যাদেশ অনুমোদনের শেষ দিন হওয়ায় শুক্রবার সরকারি ছুটির দিনেও সংসদের কার্যক্রম সকাল ও বিকেল দুই অধিবেশনে অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন মোট ২৪টি বিল পাস করা হয়।
এগুলোর মধ্যে আছে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) বিল, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, বাংলাদেশ বনশিল্প করপোরেশন বিল, বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) বিল, আমানত সুরক্ষা বিল, দ্য এক্সাইজ অ্যান্ড সল্ট (সংশোধন) বিল, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল, গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, ব্যাংক রেজোল্যুশন বিল, অর্থ (২০২৫-২৬ অর্থবছর) বিল, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল, বিশ্ববিদ্যালয়সংক্রান্ত কতিপয় আইন (সংশোধন) বিল, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা বিল, সাইবার সুরক্ষা বিল, মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংরক্ষণ) বিল, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল।
সংসদের এই সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে যেমন বেশ কিছু অধ্যাদেশ আইনি ভিত্তি হারিয়েছে, অন্যদিকে নতুন করে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগও জোরদার হয়েছে। তবে গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল হওয়াকে কেন্দ্র করে সামনে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা এতে শপথ নেননি। তবে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেছেন।