বাংলাদেশ

৩০% ভোটের সংসদে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ

মতামত- শামীম আহমেদ

  • 4:24 pm - April 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৫২ বার
৩০% ভোটের সংসদে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১১ এপ্রিল- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করে বিএনপি একটা ভয়াবহ আত্মঘাতী কাজ করল। বাংলাদেশের ন্যূনতম ৪০% মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক। বিএনপি ২২৭টি আসনে জিতে সংসদে এসে দেশের ৪০ শতাংশ মানুষের সমর্থনকে অগ্রাহ্য করে মূলত বোঝালো তারা সকলের সরকার নয়।

একটা রাজনৈতিক দলের কেউ যদি কোন আইন ভঙ্গ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়। যেমন বিএনপির বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ নানাজন শাস্তি পেয়েছেন, কেউ জেল খেটেছেন, কেউ বিদেশে পালিয়ে শাস্তি থেকে বেঁচেছেন। এরশাদও ক্ষমতা থেকে পতনের পর দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়াও প্রায় ফালতু একটা মামলায় যুগের উপর অন্তরীণ ছিলেন। কিন্তু কারও দল কখনও নিষিদ্ধ হয়নি।

এমনকি যে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী তাদেরকেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোন সরকার নিষিদ্ধ করেনি, বরঞ্চ আঁতাত করেছে। আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতা থেকে পতনের আগ মুহুর্তে ১৪ দলের সভায় জামায়েতকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়, যেটি তাদের আগের ১৭ বছরের স্বার্থসিদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছিল।

আওয়ামী লীগকে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ করার কোন আইনি ভিত্তি নেই। এটি স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রহসন এবং বিএনপি এই ফাঁদে পা দিয়ে খুব একটা বড় ভুল করল। বাংলাদেশের সংসদে বা সংবিধানে কোন দেশবিরোধী আইন টেকে না। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার করা যাবে না এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশও টেকেনি। ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ও টিকবে না।

বিএনপি মূলত আওয়ামী লীগের ভোটেই ক্ষমতায় এসেছে। ২২৭ টি আসনে জেতার বিপুল জনপ্রিয়তায়  তারেক রহমান নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারতেন। তার বাবা জিয়াউর রহমানের প্রবল জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারতেন। তিনি তা করলেন না। আফসোস, কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না।

দেশের অবস্থা ভাল না। আওয়ামী লীগের ১৭ বছর অনন্ত সুযোগ সুবিধা ভোগ বিলাসিতা উপভোগ করা বাঙালি প্রতিদিন ৪-৫ ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নেয়া, লোডশেডিং এ আক্রান্ত হওয়া, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেঙে পড়া – এগুলো বেশীদিন সহ্য করতে পারবে না। যারা বিএনপি-জামাতকে সংসদে বসিয়েছে, তারাই রাস্তায় নামবে। তারাই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফেরাবে।

আমি বুঝি না আওয়ামী লীগের এই ভয়াবহ পতনের পরও তাদের এতটা ভয় কেন পেতে হলো বিএনপির। এটিই তাদের সুবর্ণ সুযোগ ছিল আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দিয়ে নিজেদের কাজের মাধ্যমে জনগণের মন জয় করে আওয়ামী লীগকে রাজনীতির মাঠে পরাস্ত করার। ২০১৮ সালে কারচুপির নির্বাচনে বিএনপি ও তার শরিকদের মাত্র ৮ টি আসন দিয়ে আওয়ামী লীগ ভেবেছিল তাদের বিরাট অর্জন হয়েছে – মাত্র ৬ বছরেই তার মাশুল দিতে হয়েছে। বিএনপি এখন ভাবছে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে তারা খালি মাঠ পেয়ে গেল, আদতে কি পেল?

খালি মাঠ কেউ পায় না। মাঠ কখনও খালি থাকে না। প্রবল পরাক্রমশালী আওয়ামী লীগ ১৭ বছর প্রায় খালি মাঠে ব্যাপক উন্নয়ন করেও টিকতে পারল না, টেকা যায় না। যে আন্তর্জাতিক শক্তি বিএনপিকে ক্ষমতায় এনে বসিয়েছে, এখন এমন দেশবিরোধী কাজ করিয়ে নিচ্ছে; ঠিক তারাই আবার আওয়ামী লীগকেও রাজনীতির মাঠে ফেরাবে। এই চক্র থেকে মুক্তির দুটি সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল ডঃ ইউনুস এবং তারেক রহমানের হাতে, তারা তা কাজে লাগালেন না।

প্রতিহিংসার রাজনীত বড্ড ভয়ংকর। বিএনপির এখনকার নেতারা হয়ত ভাবছেন আওয়ামী লীগ আবার যখন আসবে, তাদের কেউ তো থাকবেন না, অত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করার দরকার নেই। আদতে তা হবে না। মাত্র একমাসেই বিএনপি যে পরিমাণ দলীয়করণ করেছে, সন্তান আত্মীয়দের নানা জায়গায় বসাচ্ছে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের ফল তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ভোগ করতে হবে।

সমর্থক কখনও হারিয়ে যায় না। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা সবসময় বলত জামায়েতকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে, হারিয়ে দিতে হবে, নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। করা গেছে? লাখ লাখ মানুষ জামাতের সমর্থক ছিল। এখনও আছে। গত দুই যুগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থক কমেছে, জামায়েতের সমর্থক বেড়েছে।

তখন আমি বার বার বলেছি, জামায়েতের সাথে বসে তাদের ৭১ এর পরাজয়ের জন্য ক্ষমা চাইয়ে বাংলাদেশের মূল ধারার রাজনীতি করতে দেয়া হোক। একটি স্বাধীন দেশে কাউকে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়া যায় না। আওয়ামী লীগের অতি অহংকারী অংশ সেটি শোনেনি, তাদের কথা শুনে মনে হতো তারা জামাতের ২০-৩০ লাখ সমর্থককে পাকিস্তান এয়ারলাইন্সে করে বোধহয় পরের দিনই লাহোরে পাঠিয়ে দেবে। পারেনি। জামায়েত এখন দেশের প্রধান বিরোধী দল।

একইভাবে বিএনপি জামায়েত এখন ভাবছে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে তারা বঙ্গোপসাগর কিংবা ভারতে পাঠিয়ে দেবে। আরে ভারতই তো বিএনপিকে ক্ষমতায় বসালো। তারাই বিএনপিকে বাংলাদেশে পালছে আর  আওয়ামী লীগকে ভারতে আশ্রয় দিচ্ছে। ৮ কোটি মানুষের একটা দলকে বঙ্গোপসাগরেও ফেলা যায় না, অন্য দেশেও পাঠানো যায় না।

একটা উপায় খুঁজতে হয় যেখানে নানা মতের, আদর্শের মানুষ একটা জায়গায় গিয়ে দেশের জন্য একতাবদ্ধভাবে কাজ করতে পারে। বিজেপি হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম ধর্মীয় জঙ্গী ও উগ্রবাদী রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু প্রবল জনসমর্থন নিয়ে তারা দেশের উন্নয়নে কাজ করছে। কংগ্রেসকে তাদের সাথে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। কেউ বিজেপিকে বঙ্গোপসাগরে ফেলছে না, কংগ্রেসকেও না।

ডঃ ইউনুসের ১৮ মাসে একটি reconciliation process নিয়ে আমার প্রস্তাবনা বিষয়ক একাধিক লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আজ হোক কাল হোক, ১০ বছর পর হোক; reconciliation ছাড়া দেশ চলবে না। এটা আওয়ামী লীগ বোঝেনি, জামায়েত-বিএনপিও বুঝল না। reconciliation না হলে বাংলাদেশ ভাগ হয়ে দুটো দেশে পরিণত হতে হবে। এছাড়া গত্যন্তর নেই।

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের এই সিদ্ধান্ত ন্যক্কারজনক ও হতাশাব্যঞ্জক, তবে প্রত্যাশিত। ২০২৬ এর নির্বাচনে ৩০% ভোটও কাস্ট হয়নি। আওয়ামী লীগের সমর্থরা বিএনপিকে  ভোট না  দিলে জামায়েত ক্ষমতায় চলে আসত। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নতুন জোয়ার আনার সুযোগ হারাল। প্রতিহিংসার এই রাজনীতি আবারও প্রতিহিংসা ফিরিয়ে আনবে। “ওই সময় তো আমরা বেঁচে থাকব না” – এই চিন্তা দেশের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে না।

তবে আওয়ামী লীগ নিজেদের শক্তিতে ফিরবে বলে মনে হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের মূল রাজনৈতিক নেতাদের অধিকাংশ চুরি চামারি করে পালিয়েছে। কর্মীরা অত্যাচার নির্যাতনে দিশেহারা। কখনও কোন বিকল্প নেতৃত্ব তৈরী হয়নি। অনলাইনে যারা লড়াই করে যাচ্ছেন, তারা দ্বিধাবিভক্ত। আমি কখনও আওয়ামী লীগের কোন অনলাইন যোদ্ধার নাম উল্লেখ করে, কাউকে defame করে কোন পোস্ট দিইনি দলীয় ঐক্যের স্বার্থে। কিন্তু প্রায় দেখি আমার নাম উল্লেখ করে তারা পোস্ট দিয়ে বিষোদগার করছে। এই কোন্দলপ্রেমী দল নিয়ে ক্ষমতায় ফেরা যাবে না।

হয় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে হবে, অথবা ওই বিএনপি-জামায়েতের সমর্থকদেরই তিক্ত বিরক্ত হয়ে আওয়ামী লীগকে ফেরাতে হবে বিদেশী শক্তির মদতে। এটাই আমাদের ভবিতব্য।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় আওয়ামী লীগের কোন ক্ষতি হয়নি, বরং লাভই হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিরক্ত হচ্ছে, মানুষ একতাবদ্ধ হচ্ছে। ক্ষতি হলো মূলত তারেক রহমানের। ঘৃণা-বিদ্বেষহীন একজন জাতীয় নেতা হবার যে অমূল্য, বিরল সুযোগ তার সামনে এসেছিল, তিনি সেটি হেলায় হারাচ্ছেন। এটিই দুর্ভাগ্যজনক।

বঙ্গবন্ধুর পর কেউ আর বাংলাদেশে জাতীয় নেতা হতে পারলেন না। মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা পাওয়া একটি দেশের এই দূর্ভাগ্য পরাধীনতার শেকলের চাইতেও শক্ত হয়ে জাতির গলায় বিঁধে থাকবে।

একজন সচেতন ক্যানাডিয়ান-বাংলাদেশী হিসেবে ৮ এপ্রিল ২০২৬, বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলকে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের পবিত্র জাতীয় সংসদে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রস্তাবে নিষিদ্ধের প্রতিবাদ লিপিবদ্ধ করলাম। ভবিষ্যতের দলিলে এই পোস্ট একটি পাতা হয়ে থেকে যাবে।

জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখকঃ শামীম আহমেদ, টরেন্টো কানাডা


এই কলামে প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে পত্রিকার বা সম্পাদকীয়  নীতিমালার মিল নাও থাকতে পারে।

এই শাখার আরও খবর

আবু সাঈদ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের সমালোচনা অ্যামনেস্টির, ন্যায়বিচারে স্বচ্ছতার আহ্বান

মেলবোর্ন, ১২ এপ্রিল-  রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে সাবেক দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি…

হরমুজ প্রণালি শিগগিরই খুলে দেওয়া হবে- ট্রাম্প

মেলবোর্ন, ১২ এপ্রিল-  মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালি শিগগিরই খুলে দেওয়া হবে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে…

বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলবে বাংলাদেশ, সাকিব-মাশরাফির জন্য দরজা খোলা

মেলবোর্ন, ১২ এপ্রিল- সাবেক ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণে আয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অব লিজেন্ডস’-এর তৃতীয় আসরে খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ‘বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স’ নামে এই টুর্নামেন্টে অংশ নেবে দেশের সাবেক…

২০ মাস বেতন পান না ১৭২ স্বাস্থ্যকর্মী, বিঘ্নিত বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের সেবা

মেলবোর্ন, ১২ এপ্রিল- বাংলাদেশে নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, স্নায়ুবিক দুর্বলতা ও বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের বিশেষায়িত সেবা দিতে বিভিন্ন হাসপাতালে গড়ে ওঠা ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্র’- এর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা…

পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আড়াই ঘণ্টার প্রথম দফার আলোচনা শেষ

মেলবোর্ন, ১২ এপ্রিল- পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ-এ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল আলোচিত শান্তি সংলাপের প্রথম দফা আলোচনা শেষ হয়েছে। আড়াই ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী…

ভারত থেকে এলো ১১৬ টন গম

মেলবোর্ন, ১২ এপ্রিল- দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে গম আমদানি অব্যাহত রয়েছে। শনিবার (১১ এপ্রিল) তিনটি ট্রাকে করে মোট ১১৬…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au