উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ঘিরে আলোচনায় কিম জু-এয়ের দ্রুত উত্থান
মেলবোর্ন, ১৩ এপ্রিল- উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন-এর কিশোরী কন্যা কিম জু-এয়ের ক্রমবর্ধমান প্রকাশ্য উপস্থিতি তাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তোলার ইঙ্গিত দিচ্ছে…
মেলবোর্ন, ১৩ এপ্রিল- ঋতুচক্রের অবিরাম গতিতে যখন একটি বছর তার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ায়, তখন বাঙালির জীবনে ভেসে ওঠে এক বিশেষ আবহ। চৈত্র মাসের শেষ দিন, যাকে বলা হয় চৈত্র সংক্রান্তি, কেবল একটি ক্যালেন্ডারের সমাপ্তি নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, আবেগ ও ঐতিহ্যের এক গভীর প্রতীক। জীর্ণ-পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরের আগমনের প্রস্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো বাংলা অঞ্চল।
চৈত্রের প্রখর রোদ, শুকনো পাতার শব্দ, আর প্রকৃতির নিস্তব্ধতা যেন মিলেমিশে তৈরি করে এক বিষণ্ন অথচ প্রত্যাশাময় সুর। সেই সুরেই বিদায় নেয় পুরোনো বছর, আর অপেক্ষা শুরু হয় নতুন সূচনার।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে চৈত্র সংক্রান্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দিন। তারা এদিন উপবাস পালন করেন, শিবের আরাধনা করেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় বিধান অনুসরণ করেন।
মন্দির বা ঘরে পূজা-অর্চনার পাশাপাশি সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে অন্ধকার দূর করে আলোর প্রতীকী আহ্বান জানানো হয়। এটি নতুন বছরে শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের প্রার্থনার এক অংশ।
চৈত্র সংক্রান্তির তাৎপর্য ও ইতিহাস
চৈত্র মাসের শেষ দিনই চৈত্র সংক্রান্তি এবং একই সঙ্গে এটি বাংলা বছরের শেষ দিন। এর পরদিন আসে বাংলা নববর্ষ, পহেলা বৈশাখ। এই সময়টিকে কৃষিনির্ভর সমাজে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো, কারণ বৈশাখের আগে প্রচণ্ড গরম এবং পরবর্তী সময়ে বর্ষার সূচনা কৃষিকাজে প্রভাব ফেলত।
প্রাচীনকাল থেকেই এই দিনে সূর্যের তাপ প্রশমনের প্রার্থনা এবং বৃষ্টির কামনায় নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হতো। ধীরে ধীরে এটি শুধু ধর্মীয় বা কৃষিভিত্তিক উৎসব না থেকে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় রূপ নেয়।
অনেক ঐতিহাসিকের মতে, চৈত্র সংক্রান্তির ঐতিহ্যই পরবর্তীতে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ভিত্তি তৈরি করেছে।
সার্বজনীন উৎসবে রূপান্তর
একসময় চৈত্র সংক্রান্তি মূলত পার্বত্য জনগোষ্ঠী এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সময়ের সঙ্গে এটি একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সব মানুষের অংশগ্রহণে এটি বাঙালির একটি বড় সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে স্বীকৃত।
পার্বত্য অঞ্চলে এই উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, গান, নৃত্য ও ঐতিহ্য তুলে ধরে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়।
গ্রামবাংলার চৈত্র সংক্রান্তি: প্রকৃতি ও জীবনের মেলবন্ধন
গ্রামবাংলায় চৈত্র সংক্রান্তির আবহ সবচেয়ে প্রাণবন্ত। বছরের শেষ দিনে মানুষ পুরোনো দুঃখ, কষ্ট, ব্যর্থতা ও হতাশাকে পেছনে ফেলে নতুন বছরের জন্য প্রস্তুতি নেয়।
ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসাব শেষ করে শুরু করেন নতুন বছরের ‘হালখাতা’। দোকানে দোকানে ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানোর মাধ্যমে গড়ে ওঠে সামাজিক সম্পর্কের নতুন সেতুবন্ধন।
খাদ্য সংস্কৃতিতেও এই দিনের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। অনেক এলাকায় নিরামিষ খাবারের প্রচলন দেখা যায়। কোথাও কোথাও ১৪ ধরনের শাক দিয়ে ‘শাকান্ন’ রান্না করা হয়, যা প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। কিছু অঞ্চলে ছাতু খাওয়ার প্রচলনও রয়েছে।
চৈত্র মাসে রোগব্যাধি বাড়ার আশঙ্কা থেকে তেঁতো খাবার ও শাকসবজি খাওয়ার যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তা কেবল খাদ্যাভ্যাস নয়, বরং প্রাচীন স্বাস্থ্যচিন্তার প্রতিফলন।
চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে গ্রামবাংলায় বসে নানা ধরনের মেলা। সেখানে দেখা যায় পুতুলনাচ, যাত্রাপালা, বায়োস্কোপ, পটচিত্র, লোকগান ও নৃত্য।
এই আয়োজনগুলো শুধু বিনোদন নয়, বরং বাঙালির লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি মাধ্যম। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিয়মিতভাবে এই ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছে।
নগর জীবনে চৈত্র সংক্রান্তির রূপ কিছুটা পরিবর্তিত হলেও এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব কমেনি। শহরে এখনো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান দিনটি উদযাপন করে থাকে।
বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনের মাধ্যমে এই দিনটি উদযাপন করে।
এ বছরের প্রধান আয়োজন
এ বছর চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে লোকশিল্প প্রদর্শনী, নৃত্য, সংগীত ও নাট্য পরিবেশনা।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে লোকশিল্প প্রদর্শনী ও সম্মিলিত অর্কেস্ট্রা পরিবেশনা। পাশাপাশি ধামাইল নৃত্য, জারি গান, পটগান ও পুঁথিপাঠের মাধ্যমে উপস্থাপিত হচ্ছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক আয়োজন, যেখানে লোকসংগীত, নৃত্য এবং বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে বিদায় জানানো হচ্ছে পুরোনো বছরকে।
চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষ উদযাপনে পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাকমা সম্প্রদায়ের ‘পাজন’ রান্না এই দিনের বিশেষ ঐতিহ্য।
বিভিন্ন সবজি একসঙ্গে রান্না করে তৈরি এই খাবার অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহৃত হয়। তাদের বিশ্বাস, এই খাবার সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে।
পুরান ঢাকার ঘুড়ি উৎসব
পুরান ঢাকায় চৈত্র সংক্রান্তির আরেকটি আকর্ষণ হলো ঘুড়ি উৎসব। আকাশ ভরে ওঠে রঙিন ঘুড়িতে। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ এতে অংশ নেয়, যা শহরের আকাশকে এক উৎসবমুখর রূপ দেয়।
চৈত্র সংক্রান্তি শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠান নয়, এটি বাঙালির জীবনের এক গভীর সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। এখানে আছে বিদায়ের বিষণ্নতা, আবার নতুনের আনন্দ।
গ্রাম, শহর, পাহাড়—সবখানেই এই দিনটি এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি করে, যা বাঙালির ঐতিহ্য ও পরিচয়কে আরও শক্ত করে তোলে। নতুন বছরের আগমনের আগে এই শেষ দিনটি তাই শুধু সময়ের সমাপ্তি নয়, বরং নতুন সম্ভাবনার সূচনা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au