বাংলাদেশ

ভারত সফরে খালিলুর রহমান: আস্থা পুনর্গঠন নাকি কূটনৈতিক কৌশল

বিশ্লেষণ- আমিনুল হক পলাশ

  • 1:04 pm - April 14, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৩ বার
দিল্লিতে দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে খলিলুর-জয়শঙ্করের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৪ এপ্রিল- ভারতে সাম্প্রতিক সফর শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমান এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, ঢাকা ও দিল্লি এখন পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে। ঢাকাতেও সরকারি পর্যায়ে সফরটি নিয়ে ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পুরো সফরকে উপস্থাপন করা হয়েছে গঠনমূলক, ইতিবাচক এবং সম্ভাবনাময় হিসেবে। কিন্তু এই উপস্থাপনার আড়ালে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়-বাস্তবে কী অর্জন হয়েছে? এই সফর কি সত্যিই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন কমিয়েছে, নাকি এটি ছিল কেবল আরেকটি সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক প্রদর্শন?

এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে খালিলুর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের প্রেক্ষাপটে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদী বার্তা দিলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে পারেননি। পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সেখানে তার অর্জন নিয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই। এরপর দৃশ্যমান রাজনৈতিক ভিত্তি ছাড়াই তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে বড় পদগুলো সাধারণত রাজনৈতিক ইতিহাস, সংগ্রাম বা প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়, সেখানে এমন উত্থান স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি করে।

৭ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত তার ভারত সফর ছিল কূটনৈতিক ভাষায় পরিপূর্ণ বন্ধুত্ব, সহযোগিতা, পারস্পরিক স্বার্থ ও সংযোগের কথা বলা হয়েছে। সবকিছু ছিল পরিকল্পিত ও পরিমিত। তবে বাস্তব কূটনীতিতে আনুষ্ঠানিক ভাষার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্বাস। আর এই জায়গাতেই বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রতি ভারতের আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট।

ভারত দীর্ঘদিন ধরে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির আওতায় বাংলাদেশকে কেবল একটি প্রতিবেশী দেশ নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগতভাবে দুই দেশ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তবে ভারতের অবস্থানের মূল শক্তি আবেগ নয়, বরং ধৈর্য। বাংলাদেশে যখনই ভারতবিরোধী রাজনীতি তীব্র হয়েছে, তখনও দিল্লি সম্পর্ক ছিন্ন না করে সংযম দেখিয়েছে।

বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই ধৈর্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বিভিন্ন সময়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য, ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে অবাস্তব রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ইসলামপন্থী ও অতিরাষ্ট্রবাদী গোষ্ঠীর উচ্চকণ্ঠ উপস্থিতি সত্ত্বেও ভারত সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। ভিসা কার্যক্রম সীমিত করা, কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্য প্রত্যাহার বা কিছু পরিবহন সুবিধা স্থগিতের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মৌলিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। এমনকি দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা সহায়তা পাঠানো এবং আঞ্চলিক সম্মেলনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চালিয়ে যাওয়াও সেই সংযমেরই উদাহরণ।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় ফেরার পরও ভারত শীতলতা দেখায়নি। বরং কূটনৈতিক সৌজন্য বজায় রেখে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। জ্বালানি সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়াও তার প্রমাণ।

এই প্রেক্ষাপটে খালিলুর রহমানের সফর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। সরকারি বিবৃতিতে পারস্পরিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলা হলেও প্রকৃত প্রশ্নগুলো ছিল আলোচনার আড়ালে। দিল্লি মূলত যাচাই করতে চেয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার কি সত্যিই স্থিতিশীল ও আন্তরিক সম্পর্ক চায়, নাকি দেশের ভেতরে এক ধরনের রাজনীতি চালিয়ে বাইরে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে?

ভারতের উদ্বেগের অন্যতম কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা। রাজনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সন্দেহজনক কূটনৈতিক তৎপরতা দিল্লিকে ভাবিয়ে তুলেছে। একইভাবে চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কিছু অর্থনৈতিক প্রকল্পে পরিবর্তনও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এখন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে। বিরোধী মতের ওপর চাপ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা এবং ধর্মীয় উগ্রতার উত্থান ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করছে। এসব বিষয় শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলে।

এখানেই বর্তমান সরকারের মূল দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের ভাষা নমনীয়, কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। আস্থা গড়তে ধারাবাহিকতা প্রয়োজন, যা এখানে অনুপস্থিত। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করার কথা বলা হলেও পরে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইভাবে ভারতবিরোধী বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রভাবও রয়ে গেছে।

ভারত মতপার্থক্য মেনে নিতে পারে, কিন্তু দ্বৈত অবস্থান গ্রহণকারী সরকারের ওপর দীর্ঘমেয়াদে আস্থা রাখা কঠিন। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এই ধরনের দ্বৈত নীতি টেকসই নয়।

এই বাস্তবতায় খালিলুর রহমানের সফরকে বড় কোনো মোড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা কঠিন। এটি হয়তো একটি সুযোগ তৈরি করেছে, কিন্তু সেই সুযোগ বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ নিতে হলে নীতিগত ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। কেবল কূটনৈতিক ভাষা দিয়ে সম্পর্কের সংকট দূর করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের জন্য এই সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি, অর্থনীতি, পানি বণ্টন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অপরিহার্য। তাই কৌশলগত বাস্তবতা উপেক্ষা করে কেবল রাজনৈতিক সুবিধার জন্য সম্পর্ক পরিচালনা করলে তার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপরই।

ভারত ইতোমধ্যে সম্পর্কের দরজা খোলা রেখেছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা ঢাকার। সরকার যদি সত্যিই সম্পর্ক উন্নয়ন চায়, তবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে হবে। অন্যথায়, এই ধরনের সফর কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই থেকে যাবে, যার বাস্তব প্রভাব খুবই সীমিত।

লেখকঃ আমিনুল হক পলাশ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ; অনুবাদ ও সম্পাদনা: ওটিএন বাংলা

এই শাখার আরও খবর

‘ইতালির সঙ্গে আমাদের কোনো নিরাপত্তা চুক্তি নেই’- ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

মেলবোর্ন, ১৫ এপ্রিল- ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সাম্প্রতিক মন্তব্যের জবাবে ইসরায়েল জানিয়েছে, দেশটির সঙ্গে ইতালির কোনো আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা চুক্তি নেই। ফলে ইতালির পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা…

আন্দামান সাগরে নৌকাডুবে বাংলাদেশিসহ ২৫০ অভিবাসী নিখোঁজ

মেলবোর্ন, ১৫ এপ্রিল- আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী একটি নৌকা ডুবে বাংলাদেশিসহ ২৫০ জনেরও বেশি অভিবাসী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক…

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির পথ তৈরি করে দিচ্ছে: রাহুল গান্ধী

মেলবোর্ন, ১৫এপ্রিল- পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী। তার দাবি, রাজ্যে তৃণমূল…

বিহারের ইতিহাসে প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী

মেলবোর্ন, ১৫এপ্রিল- বিহারের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন ঘটেছে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের পদত্যাগের পর। দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসানে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বিজেপি নেতা…

চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরখাস্ত

মেলবোর্ন, ১৪ এপ্রিল-  চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান ওয়েইদংকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোতে…

মন্দিরের সামনে পাওয়া গেল প্রভাত চন্দ্রের গলাকাটা লাশ

মেলবোর্ন, ১৪ এপ্রিল- নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় কালী মন্দিরের সামনে থেকে প্রভাত চন্দ্র রায় (৫৫) নামে এক কৃষকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল)…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au