ভিক্টোরিয়ার মেলটন সাউথে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি শিশুর মৃত্যু
মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের মেলটন সাউথে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) বিকেলে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় শোক…
মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- নিষেধের দেয়াল ভেঙে একজন বাংলাদেশি হিসেবে কয়েক বছর আগে তার ইসরায়েল ভ্রমণ তুমুল বিতর্ক তৈরি করেছিল। পরে সেই তুমুল বিতর্ক প্রচণ্ড ঝড়ে পরিণত হয়, যখন তিনি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেন। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে এমন সিদ্ধান্ত যিনি নিয়েছিলেন, তার নাম ডা. সাদমান জামান শুদ্ধ।
তার আগের পরিচয় ছিল- বাংলাদেশের একজন মেধাবী ছাত্র, ভালো চিকিৎসক এবং একজন পুরোদস্তুর মুসলিম তরুণ হিসেবে। কিন্তু ২০১৭ সালে তার এই পরিচয়টা গল্পের মতো পাল্টে যায়। সেই বছরের ২৭ নভেম্বর ইসরায়েলের একাধিক গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করে- ডাক্তার সাদমান জামান শুদ্ধ নামে একজন বাংলাদেশি তরুণ ইসরায়েলে আশ্রয় নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি দেশটির নাগরিকত্বের জন্যও আবেদন করেছেন।
সেই সময় ইসরাযেলের গণমাধ্যমগুলো আরও জানায়, বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে ইসরায়েলে বেড়াতে আসা প্রথম বাংলাদেশি ডাক্তার সাদমান জামান শুদ্ধ। সেদিনের পর থেকে তার জীবনের মোড় ঘুরতে থাকে। ইসরায়েলে পাড়ি দেওয়া হতে শুরু করে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ- তাকে নায়ক থেকে খলনায়কে পরিণত করে।
নতুন করে আলোচনায়
সেই ডা. সাদমান জামান শুদ্ধ নতুন করে আবার আলোচনায় এসেছেন ব্রিটিশ স্থানীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে। আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য ‘বারির পিলকিংটন পার্ক’ আসন থেকে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ‘রিফর্ম ইউকে’ দলের হয়ে কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছেন তিনি।
শুরুটা হয়েছিল চট্টগ্রামে
সাদমান জামানের শুরুটা ছিল বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে। ২০০৭ সালে চট্টগ্রামের স্বনামধন্য কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি এবং ২০০৯ সালে মহসিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়তে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে ২০১৬ সালে এমবিবিএস শেষ করেন। সেখানেই ইন্টার্ন শেষে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে কর্মজীবন শুরু করেন এই তরুণ চিকিৎসক।
পরিবর্তনের নেপথ্যে পরিবার
ডা. সাদমানের এমন আমূল পরিবর্তনের নেপথ্যে কাজ করেছিল তার পারিবারিক পরিবেশ। এ নিয়ে তিনি গণমাধ্যমে বলেন, ‘শৈশবেই তার দাদা ইসরায়েল ও ইহুদি ধর্মের প্রতি আগ্রহের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। দাদার সেই অনুপ্রেরণা আর ইসরায়েলপন্থী আদর্শ নিয়েই বড় হতে থাকেন সাদমান।
লন্ডন অধ্যায়
এরপর সাদমান জামান শুদ্ধ চলে যান লন্ডনে। কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে ইউকের ল্যাঙ্কাশায়ারের ব্লাকপুল ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের ট্রমা বিশেষজ্ঞ হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। কুইন মেরি ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় তিনি সরাসরি যুক্ত হন ‘জিউস সোসাইটি’র সাথে। সেই বছরের নভেম্বর মাসেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেন।
লন্ডনে থাকাকালীন তিনি ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে নানা কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন এবং ‘ফ্রেন্ডস অব ইসরায়েল’-এর মতো সংগঠনের নেতৃত্বে চলে আসেন।
ইনেট নামে ইসরায়েলের একটি গণমাধ্যমকেডা. সাদমান জামান বলেন, ‘আমি নিজেকে ইসরায়েল ও ইহুদিদের রাষ্ট্রদূত মনে করি।’ বিশ্বব্যাপী ইসরায়েলবান্ধব মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন সাদমান।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাশায়ারে ট্রমা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত সাদমান শুদ্ধ নিজেকে ইসরায়েল ও ইহুদিদের ‘স্বঘোষিত রাষ্ট্রদূত’ মনে করেন। এমনকি বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের স্বপ্নে ২২ জন বাংলাদেশি তরুণকে নিয়ে একটি কমিটি তৈরিরও চেষ্টা করছেন তিনি।

ইসরায়েলের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত
বিতর্ক উসকে ইসরােয়েলে
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সবচেয়ে বড় বিতর্কটি উসকে দেন। সেইবার বাংলাদেশি পাসপোর্টে ইসরায়েল ভ্রমণে স্পষ্ট আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা অমান্য করে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলে পা রাখেন।
সাংবাদিকদের তিনি জানান, এটি ছিল তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। পরবর্তীতে তিনি ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টের বাসভবন পরিদর্শনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে ইসরায়েলের হয়ে লবিং শুরু করেন।
স্কুলে শেখানো হতো ইহুদি বিদ্বেষ
ইসরায়েলের বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডা. সাদমান বলেন, “সুন্নি মুসলমানের দেশ হিসেবে বাংলাদেশে তার চারদিকেই ছিল ইহুদি বিদ্বেষ। স্কুলের পাঠ্যবইতেই লেখা ছিল- ‘ইহুদিরা হচ্ছে শয়তানের প্রতিরূপ অথবা ইহুদিবাদীরাই বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করছে’। ক্যামব্র্রিজের কারিকুলামে পরিচালিত আমাদের স্কুলেও ইহুদি বিদ্বেষ শেখানো হতো।”
বদলে দেয় ‘দ্য কেস ফর ইসরায়েল’
তার ভাগ্য ভালো জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বাড়ির পরিবেশ ছিল আলাদা। পরিবারের খোলামেলা পরিবেশ তাকে ইসরায়েল সম্পর্কে ভালো ধারণা পেতে সাহায্য করেছে। তবে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এনে দিয়েছে এলান ডেরশোচিদের বই দ্য কেস ফর ইসরায়েল।’
এই বইটি দাদা তার জন্য এনেছিলেন। ১২ বছর বয়সে তা পড়ার পর ইহুদিদের সম্পর্কে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয় তার মধ্যে।
জামান বলেন, “বাংলাদেশে মনে করা হয় ইসরায়েল শুধু ইহুদিদের দেশ। কিন্তু আমার দাদাই প্রথম ব্যক্তি যিনি বলতেন ইসরায়েলেরও টিকে থাকার অধিকার আছে।”
স্বাধীনতাযুদ্ধে ইসরায়েলের অবদান
সাদমান জামানের মতে, ইসরায়েল বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সাহায্য করলেও ইতিহাসের ওই অংশ কখনই উল্লেখ করা হয় না। ১৯৭২ সালে ইসরায়েল স্বীকৃতি দিলে তা অস্বীকার করে বাংলাদেশ।
মূলত আরব দেশগুলো থেকে সাহায্য পেতেই বাংলাদেশ ওই স্বীকৃতি অস্বীকার করে জানিয়ে জামান বলেন, ‘তার দাদা বাংলাদেশ-ইসরায়েল সম্পর্ক তৈরিতেও দরকষাকষি করেছেন।’
জুতা আর ঘড়ি পরে ইসরায়েলে
দাদার দেওয়া জুতা আর ঘড়ি পরেই সাদমান ইসরায়েলে যান। কারণ তার দাদা মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, ইসরায়েল হবে তোমার প্রথম দেশ, যেখানে তুমি যাবে। বেঁচে থাকতেই তিনি তার জুতা আর ঘড়ি দিয়ে গেছেন।
তাই সাদমান প্রথমবারের মতো ইসরায়েলে এসেছিলেন দাদার দেওয়া সেই জুতা আর ঘড়ি পরেই। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যাতে অনুভব করতে পারেন, দাদা তার সঙ্গে ইসরায়েলেই আছেন।’
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পরিদর্শনে ডা. সাদমান জামান শুদ্ধ। ছবি: সংগৃহীত
এখনো পাচ্ছেন হত্যার হুমকি
ইসলাম ত্যাগ করে ইহুদি ধর্ম গ্রহণের পর থেকেই সাদমান জামান হত্যার হুমকি পাচ্ছেন। তবে পারিবারিক যোগাযোগের কারণে রক্ষা পেয়েছেন। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বাবা-মা তাকে যুক্তরাজ্যে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। এরপরই তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান। পরে সেখান থেকে ইসরায়েলে আসেন।
কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা
জেরুজালেম পোস্টের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সাদমান জামান বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়নি। তবে তিনি এই কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। আরও ২২ জন সমমনা বাংলাদেশি মিলে একটি কমিটি তৈরি করেছেন। এই কমিটি বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখবেন।
ডা. সাদমান জামানের নির্বাচনে প্রচারণার মূল বিষয় হলো সরকারি পরিষেবার মানোন্নয়ন, উন্নত রাস্তাঘাট নিশ্চিত করা এবং ইহুদিবিদ্বেষ বা অ্যান্টি-সেমিটিজমের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা।
বর্তমানে রিফর্ম ইউকে দলের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে লন্ডনে বিভিন্ন প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন তিনি।

ডা. সাদমান জামান নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করছেন। ছবি: ফেসবুক
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au