অ্যানজাক ডে স্মরণসভায় আদিবাসীদের বক্তব্য চলাকালে বুয়িং। ছবিঃ সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, সিডনি ও পার্থে অ্যানজাক(ANZAC) ডে এর স্মরণসভায় “ওয়েলকাম টু কান্ট্রি” অনুষ্ঠান চলাকালে আদিবাসী নেতাদের বক্তব্যের সময় কিছু দর্শকের বর্ণবাদী কটূক্তি বা অবমাননাকর শব্দ ব্যবহারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে দেশটির সামরিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল। ঘটনাটি ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, মেলবোর্নের শ্রাইন অব রিমেমব্রেন্সে বুনুরং জনগোষ্ঠীর প্রবীণ আন্টি মার্ক ব্রাউন যখন আনুষ্ঠানিক “ওয়েলকাম টু কান্ট্রি” বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন দর্শকদের একটি অংশ থেকে কটূক্তি শোনা যায়। একই ধরনের ঘটনা ঘটে সিডনির অ্যানজাক ডে অনুষ্ঠানেও ঘটে। সেখানে পাস্টর রে মিনিকিন বক্তব্য দেওয়ার সময়ও কিছু ব্যক্তি তাকে বাধা দেন এবং কটূক্তি করেন। পার্থের অনুষ্ঠানেও একই ধরনের আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পাস্টর রে মিনিকিন বহু দশক ধরে সামরিক পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। তিনি ঘটনাটিকে গভীরভাবে হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার ভূমি আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত মালিকানার অংশ, এবং সেই বাস্তবতাকে সম্মান করা উচিত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কী অপরাধের কারণে এমন ঘৃণা তৈরি হচ্ছে।

অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রদ্ধা জানানো। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া গুণ্ডিতজমারা সম্প্রদায়ের প্রবীণ ও যুদ্ধসেবায় অংশ নেওয়া রিকি মরিস বলেন, অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রদ্ধা জানানো, কিন্তু কিছু লোকের আচরণ সেই পরিবেশকে ব্যাহত করেছে। তবে তিনি জানান, উপস্থিত অধিকাংশ মানুষ করতালির মাধ্যমে ওই নেতিবাচক আচরণকে আড়াল করে দেন।
ঘটনার পর প্রতিক্রিয়ায় ভিক্টোরিয়া রাজ্যের প্রিমিয়ার জ্যাসিন্তা অ্যালান এটিকে “অত্যন্ত নিন্দনীয় আচরণ” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অ্যানজাক ডে হলো সেই দিন, যখন যুদ্ধাহত ও শহীদদের প্রতি সম্মান জানানো হয়, সেখানে এমন আচরণ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেসও ঘটনাটিকে “গভীরভাবে অসম্মানজনক” বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, অ্যানজাক ডে হলো শ্রদ্ধার দিন, সেখানে এ ধরনের আচরণ পুরো অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ন করে।
অস্ট্রেলিয়ার সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত প্রধান মেজর জেনারেল রিচার্ড ভ্যাগ বলেন, যারা দেশকে সেবা দিয়েছেন, তারা এমন আচরণে গভীরভাবে ব্যথিত হবেন। তাঁর মতে, এই ধরনের আচরণ আনজ্যাক ডের মূল চেতনার পরিপন্থী।
পুলিশ জানিয়েছে, সিডনির অনুষ্ঠান থেকে একজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে এবং পরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। পার্থে পুলিশ ১০ জনকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য নির্দেশনা জারি করে। মেলবোর্নে ঘটনার সময় কয়েকজনকে শনাক্ত করার চেষ্টা করা হলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
ভিক্টোরিয়া রাজ্যের রিটার্নড সার্ভিসেস লীগ জানিয়েছে, প্রায় ৫০ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই স্মরণসভায় কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার বাইরে অধিকাংশ মানুষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সংগঠনটির মতে, যারা এ ধরনের আচরণ করেছে, তারা এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যকে অসম্মান করেছে।
এদিকে, অনুষ্ঠান শুরুর আগে অনলাইনে কিছু ডানপন্থী ও অভিবাসনবিরোধী গোষ্ঠী “ওয়েলকাম টু কান্ট্রি” চলাকালে বুয়িং করার আহ্বান জানিয়ে প্রচারণা চালায় বলে জানা গেছে। সামাজিক মাধ্যমে এমন পোস্ট ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেক দর্শক জানান, তারা পুরো ঘটনাটি দেখে হতবাক হয়েছেন। কেউ কেউ বলেন, অধিকাংশ মানুষের করতালিতে নেতিবাচক শব্দ চাপা পড়ে যায়, যা পরিস্থিতিকে কিছুটা শান্ত করে।
আদিবাসী সম্প্রদায়ের নেতারা এই ঘটনার পরও শ্রদ্ধা ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে সামগ্রিকভাবে ঘটনাটি অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় স্মরণ দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে সামাজিক বিভাজন ও উত্তেজনার একটি নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ