পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা মনোজ কুমার আগরওয়াল। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১ মে- পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ এবং সংঘর্ষমুক্ত করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন যে বিস্তৃত পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, তা এবার প্রকাশ্যে এসেছে। কমিশন সূত্রে জানা যাচ্ছে, প্রায় ১০ মাস ধরে ধাপে ধাপে তৈরি করা এই পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বুথ স্তরের নিরাপত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ।
এই পুরো প্রক্রিয়ার শুরু হয় নদিয়ার কালীগঞ্জের উপনির্বাচনের পর। ওই নির্বাচনকে কমিশনের ভাষায় “লিটমাস টেস্ট” হিসেবে দেখা হয়। সেখান থেকেই অভিজ্ঞতা নিয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা মনোজ কুমার আগরওয়াল ভোট ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করেন। ১৯৯০ ব্যাচের এই আইএএস অফিসার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বুথ নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন।
কালীগঞ্জের অভিজ্ঞতা থেকে কমিশন বুঝতে পারে, বুথের ভেতরে ইভিএমে কারচুপি, সিসিটিভি ক্যামেরা আড়াল করা, বা ভোটের আগের দিন থেকেই যন্ত্রপাতির সঙ্গে হস্তক্ষেপ করার মতো ঝুঁকি থেকে যায়। এই কারণেই পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনের জন্য আগেই একটি কঠোর কাঠামো তৈরি করা হয়, যাতে বুথের ভেতর বা আশেপাশে কোনোভাবেই অনিয়ম ঘটানো সম্ভব না হয়।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে রেকর্ডভাঙা ভোট। ছবিঃ সংগৃহীত
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে কোনো ধরনের ভিড় বা অপ্রয়োজনীয় জমায়েত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। বুথের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরাসরি কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে দেওয়া হয়। ভোটের আগের দিন থেকেই তারা বুথে উপস্থিত থেকে ইভিএম, ভিভিপ্যাট এবং সিসিটিভি ক্যামেরার পূর্ণ দায়িত্ব নেয়।
একই সঙ্গে প্রযুক্তিকে নিরাপত্তার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি বুথে সিসিটিভি এবং ওয়েবক্যামের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালানো হয়। কমিশন স্পষ্ট নির্দেশ দেয়, ক্যামেরা ঢেকে দেওয়া বা দিক পরিবর্তন করার মতো কোনো ঘটনা ঘটলে তা সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এমনকি বুথের ভেতরে একাধিক ব্যক্তি একসঙ্গে থাকলে তা শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে কন্ট্রোল রুমে সংকেত পাঠায়।
নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করতে ভোটার যাচাইয়ের জন্য বুথের বাইরে ভোটার সহায়তা কেন্দ্র তৈরি করা হয়। সেখানে ভোটারের পরিচয় যাচাই করে তবেই বুথে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে অপ্রাসঙ্গিক বা অননুমোদিত প্রবেশ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

জমে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। ছবিঃ আনন্দবাজার
কমিশনের পরিকল্পনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা বা কুইক রেসপন্স টিম। কোনো ধরনের অশান্তি বা হুমকির পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত বাহিনী পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এই ব্যবস্থা রাখা হয়। পাশাপাশি একটি বিশেষ হেল্পলাইন চালু করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন।
কমিশনের দাবি অনুযায়ী, এই পুরো ব্যবস্থার ফলে বুথের ভেতর কোনো ধরনের অনিয়ম বা দখলদারিত্বের সুযোগ তৈরি হয়নি। শুধু বুথ নয়, আশপাশের এলাকাতেও বড় ধরনের কোনো অশান্তির ঘটনা ঘটেনি।
এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সহিংসতা শূন্যে নামিয়ে আনা। কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটের দিন বা প্রচারপর্বে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তুলনামূলকভাবে ২০২১ সালের নির্বাচনে ২৪ জন এবং ২০১৬ সালে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল রাজনৈতিক সহিংসতায়। এবার সেই সংখ্যা শূন্যে নেমে আসে, যা কমিশন তাদের বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। ছবিঃ সংগৃহীত
ভোটের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল, দুই দফাতেই ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই একতরফাভাবে বদলি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি এই বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চিঠিও দেন এবং দাবি করেন, আগে সাধারণত তিনজনের প্যানেল থেকে রাজ্যের মতামত নেওয়া হতো, যা এবার অনুসরণ করা হয়নি।
অন্যদিকে কমিশন জানায়, নির্বাচনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং নিরাপদ রাখতেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভোটের পর এবার নজর পড়েছে গণনার দিকে। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরওয়াল নিজে গণনাকেন্দ্রগুলো পরিদর্শনে যাবেন বলে জানা গেছে। ৪ মে ভোট গণনা অনুষ্ঠিত হবে। কমিশন সূত্রে বলা হয়েছে, প্রতিটি গণনাকেন্দ্রে নিরাপত্তা, প্রোটোকল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা তিনি সরেজমিনে যাচাই করবেন।
এবার গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা আরও কমিয়ে আনা হয়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে ৯০টি কেন্দ্র ছিল, ২০২১ সালে তা বেড়ে ১০৮ হয়েছিল, এবার সেটি কমিয়ে ৭৭টি করা হয়েছে। জেলা ধরে গণনার স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া আরও কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে।
গণনাকেন্দ্রে প্রবেশের ক্ষেত্রেও কঠোর ত্রিস্তরীয় যাচাই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রথমে আইডি কার্ড যাচাই, পরে নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং শেষ ধাপে কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে প্রবেশ নিশ্চিত করা হবে।
কমিশনের দাবি, এই পুরো কাঠামোর লক্ষ্য একটাই, ভোট এবং গণনা প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরাপদ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করা, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা সহিংসতার সুযোগ না থাকে।
সূত্রঃ আনন্দবাজার