মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৮ মে- ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও সংঘাত নিরসনের আলোচনা থমকে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তেহরানকে কঠোর বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের “সময় ফুরিয়ে আসছে” এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে দেশটির “আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না”।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, “তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। না হলে তাদের আর কিছুই থাকবে না। এখন সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য আসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনার ঠিক আগে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, যুদ্ধবিরতি এবং পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
এদিকে ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, সংঘাত নিরসনে তেহরান সম্প্রতি যে প্রস্তাব দিয়েছে, তার জবাবে ওয়াশিংটন কোনো বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি হয়নি। ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অনমনীয় অবস্থানের কারণে আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান যদি সমঝোতায় না আসে তাহলে “পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে”। সর্বশেষ বক্তব্যেও সেই ধরনের কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন দেখা গেছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের দাবিগুলোকে “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য” বলে প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি “জীবনরক্ষাকারী সহায়তার ওপর টিকে আছে” এবং পরিস্থিতি খুবই নাজুক।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দাবি করেছেন, তেহরানের প্রস্তাব ছিল “দায়িত্বশীল” এবং “উদার”। তিনি বলেন, ইরান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সংঘাত বন্ধে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দিয়েছে।
ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, তেহরানের প্রস্তাবের মধ্যে ছিল সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। বিশেষ করে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান হামলা বন্ধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে ইরানের ওপর নতুন হামলা না চালানোর নিশ্চয়তাও চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের আরেক আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস জানিয়েছে, তেহরানের প্রস্তাবের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি শর্ত দিয়েছে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে, ইরানকে কেবল একটি পারমাণবিক স্থাপনা চালুর অনুমতি দেওয়া হবে এবং তাদের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিতে হবে।
ট্রাম্প গত শুক্রবার ইঙ্গিত দেন, ইরান যদি ২০ বছরের জন্য তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখে, তাহলে ওয়াশিংটন সেটি বিবেচনা করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের আগের অবস্থান থেকে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দেয়। কারণ এর আগে ওয়াশিংটনের অবস্থান ছিল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাহিনী ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। পরে আলোচনার সুযোগ তৈরির জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও মাঝেমধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।
বর্তমানে ইরান এখনো হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে জলপথটি কার্যত বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ অব্যাহত রেখেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পাকিস্তান বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। তবে দুই পক্ষের অবস্থানে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে এবং দ্রুত সমঝোতার সম্ভাবনা অনিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্রঃ বিবিসি