ইরানের পতাকায় দেশটির নেতাদের ছবি। রয়টার্স
মেলবোর্ন, ২২ মে- পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরান। নিজেদের সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই বিদেশে পাঠানো হবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হুমকির জবাবে “নতুন ও অত্যাধুনিক অস্ত্র” ব্যবহারেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
ইরানের এই অবস্থান দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পরমাণু চুক্তিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও চুক্তির লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে এখনো যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে ওয়াশিংটন এবং তা বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তেহরান।
পরমাণু ইস্যুকে কেন্দ্র করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। টানা প্রায় ছয় সপ্তাহ সংঘাত চলার পর ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মাত্র একবার সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি আসেনি।
এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে বিভিন্ন প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাব আদান-প্রদান চললেও এখন পর্যন্ত কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। মূল বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং দেশটির কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানকে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে সরিয়ে নিতে হবে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, এসব ইউরেনিয়াম ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে তেহরান।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি নির্দেশ দিয়েছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো অবস্থাতেই বিদেশে পাঠানো যাবে না। রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, একবার এসব ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠিয়ে দিলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার মুখে দেশটি আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বর্তমানে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার খুব কাছাকাছি বলে মনে করা হয়। যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান এসব ইউরেনিয়ামের অর্ধেক বিদেশে পাঠাতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। তবে ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, যুদ্ধ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারাবাহিক হুমকির পর তেহরান সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে।
গত বুধবারও ইরানের বিরুদ্ধে আবার সামরিক অভিযান শুরুর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, চুক্তির বিষয়ে ইরানের জবাবের জন্য তিনি অপেক্ষা করছেন। তবে সন্তোষজনক জবাব না পেলে দ্রুত আবার হামলা শুরু হতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, “বিশ্বাস করুন, আমরা যদি সঠিক জবাব না পাই, তাহলে খুব শিগগিরই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমরা ইরানের দিকে যাত্রা শুরু করতে প্রস্তুত।”

ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবিঃ সংগৃহীত
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফা প্রস্তাব পাঠিয়েছিল ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেরি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন সেই প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে এবং সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। রুশ গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানি এক কর্মকর্তা দাবি করেন, তাদের কাছে এমন কিছু অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে, যেগুলো এখনো কোনো যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়নি। প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
এদিকে পরিস্থিতি যাতে আবার পূর্ণমাত্রার সংঘাতে রূপ না নেয়, সে লক্ষ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগও শুরু হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তার এই সফরের উদ্দেশ্য হলো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমানো এবং নতুন করে সমঝোতার পথ তৈরি করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ইউরেনিয়াম ইস্যু এখন শুধু একটি পরমাণু বিতর্ক নয়, বরং তা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক কূটনীতির জন্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সে দিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
সূত্রঃরয়টার্স ও আল–জাজিরা