ঈদযাত্রায় সড়কে গাড়ির দীর্ঘ চাপ। ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১ জুন- পবিত্র ঈদুল আজহাকে ঘিরে ঘরমুখো মানুষের ভিড়ে দেশের সড়ক-মহাসড়ক যখন যানবাহনে ঠাসা, তখনই একের পর এক দুর্ঘটনায় রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা। গত মঙ্গলবার থেকে রোববার পর্যন্ত মাত্র ছয় দিনে দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহাসড়কে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৭ জন নিহত এবং ৯০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শিশু, শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধ, শ্রমজীবী মানুষসহ একই পরিবারের একাধিক সদস্যও রয়েছেন।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গোপালগঞ্জে। ঈদের দিন ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের বেদগ্রাম এলাকায় বাস ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের তিন সদস্যসহ পাঁচজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন পিরোজপুরের সোহাগ, তার স্ত্রী খাদিজা খাতুন এবং তাদের ছয় বছরের ছেলে আরমান। এ দুর্ঘটনায় আরও ১১ জন আহত হন।
নেত্রকোনায় পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান পাঁচজন। সদর উপজেলার চল্লিশা বাইপাস এলাকায় যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় তিন নারী নিহত হন। অন্যদিকে কলমাকান্দায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান দুই যুবক নীরব ও সোহান।
ফরিদপুরের মধুখালীতে ঈদের দিন পদ্মা সেতু দেখতে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের সংঘর্ষে দুই বন্ধু রাজন শেখ ও ইব্রাহিম ফকির নিহত হন। একই জেলায় পৃথক দুর্ঘটনায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়।
ময়মনসিংহে পিকআপ ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত হন জাহাঙ্গীর আলম ও তার আড়াই বছরের শিশু ছেলে রুহান। ঈদের আনন্দ মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয় পরিবারটির জন্য।
নরসিংদীর শিবপুরে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই তরুণ নিহত হন। পটুয়াখালীর গলাচিপায় মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার সংঘর্ষে প্রাণ হারান দুই চাচাতো ভাই তামিম হাওলাদার ও ফয়সাল।
চট্টগ্রামের রাউজানে ঘুরতে গিয়ে ফেরার পথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন দুই কিশোর সীমান্ত দাশ ও জয় মল্লিক। সাতক্ষীরার তালায় পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে সংঘর্ষে দুই মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়।
দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের সংঘর্ষে প্রাণ হারান কলেজছাত্র জাবির খালেদ ও তার বন্ধু আহনাদ তহমিদ রিয়াদ। নাটোরের সিংড়া, নড়াইলের লোহাগড়া, জামালপুর, চাঁদপুর, গাইবান্ধা, পাবনা, টাঙ্গাইল, কক্সবাজার, কুষ্টিয়া ও কিশোরগঞ্জেও পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
চাঁদপুরে ট্রাকের ধাক্কায় এসএসসি পরীক্ষার্থী জোহা নিহত হন। কিশোরগঞ্জে বাসচাপায় প্রাণ হারায় প্রথম শ্রেণির ছাত্রী ছয় বছরের মরিয়ম আক্তার। গাইবান্ধায় যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে নিহত হন এক নারী যাত্রী। কুষ্টিয়ায় সেনাবাহিনীর বাস ও যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে একজন নিহত এবং অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ জন আহত হন।
এদিকে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত এসব দুর্ঘটনার অধিকাংশই ঘটেছে বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিং, মোটরসাইকেলের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল এবং চালকদের অসতর্কতার কারণে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা।
ঈদের আনন্দঘন সময়ে এমন প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মহাসড়কে কঠোর নজরদারি, গতিনিয়ন্ত্রণ, চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতি উৎসব মৌসুমেই এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটতে থাকবে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক দুর্ঘটনায় অসংখ্য পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দেওয়া এই প্রাণহানি আবারও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে জাতীয়ভাবে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।