বিশ্ব

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির পথে কেন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েল

  • 12:38 pm - June 04, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২০১ বার
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের সুপ্রিম লিডার মুজতবা খামেনি ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ছবিঃ বিবিসি

মেলবোর্ন, ৪ জুন- নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক চাপ, লেবানন ইস্যু এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি উদ্যোগকে জটিল করে তুলেছে। সম্ভাব্য সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে উঠেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে ওয়াশিংটনের আগ্রহ থাকলেও ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সামরিক কৌশল সেই প্রচেষ্টাকে বারবার কঠিন করে তুলছে।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে আলোচনা চলছিল বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। তবে এই আলোচনার বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান। বিশেষ করে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহবিরোধী হামলার হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

গত সোমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দেন, হিজবুল্লাহকে দুর্বল করতে প্রয়োজন হলে বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হবে। এর পরপরই ইরান জানিয়ে দেয়, লেবাননে সংঘাত অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যেকোনো আলোচনা স্থগিত রাখা হবে। ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী যে শান্তিচুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, সেটি নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে একটি উত্তপ্ত ফোনালাপের খবর প্রকাশ্যে আসে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ট্রাম্প। একাধিক সূত্রের দাবি, আলোচনার অগ্রগতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলায় তিনি নেতানিয়াহুর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। যদিও ইসরায়েলি সূত্রগুলো বলছে, দুই নেতার মধ্যে মূলত যুদ্ধবিরতির পরিধি ও ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল।

পরবর্তীতে ট্রাম্প বিষয়টিকে ছোটখাটো মতবিরোধ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা দুই নেতার মধ্যকার সম্পর্কের ভেতরে থাকা চাপকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর বর্তমান অবস্থান শুধুমাত্র আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিবেচনায় নয়, বরং তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ইসরায়েলে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তিনি এখন প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। দেশটির পার্লামেন্ট নেসেট ভেঙে দেওয়ার প্রস্তাব প্রথম ধাপেই বিপুল ভোটে পাস হয়েছে, যা আগামী মাসগুলোতে নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

একই সময়ে গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতের কারণে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তাও চাপে পড়েছে। যদিও ইরানি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পর তাঁর জনপ্রিয়তায় সাময়িক উত্থান দেখা গিয়েছিল, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই সমর্থন আবার কমতে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তারা মনে করেন, নেতানিয়াহুর এখন এমন একটি রাজনৈতিক বয়ানের প্রয়োজন, যা ভোটারদের সামনে তাঁর নেতৃত্বকে সফল হিসেবে তুলে ধরতে পারে। সেই কারণে তিনি হিজবুল্লাহ বা ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান থেকে সহজে সরে আসতে চাইবেন না।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, তিনি সামরিক অভিযান চালিয়ে গিয়ে বিজয়ের দাবি করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমাতে পারেন। কিন্তু দ্বিতীয় পথটি তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকদের একটি অংশের কাছে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হতে পারে। ফলে তিনি সংঘাত অব্যাহত রাখার কৌশলকেই বেশি সুবিধাজনক মনে করছেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি ভিন্ন। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান উদ্বেগের একটি হচ্ছে জ্বালানি বাজার। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও পড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে একই সঙ্গে তারা ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থও উপেক্ষা করতে পারছে না। ফলে ওয়াশিংটনকে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

সমীকরণের আরেক পাশে রয়েছে ইরান। দেশটি হরমুজ প্রণালিকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তেহরানের হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন অবরোধে ইরানের অর্থনীতিও বড় ধরনের সংকটের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে তেল রপ্তানি ও সরকারি আয়ের ওপর এর প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন লেবানন ইস্যু। ইসরায়েল যদি সেখানে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে, তাহলে ইরান আলোচনার টেবিলে ফিরতে অনাগ্রহী হতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা বা অবরোধ শিথিলের মতো পদক্ষেপ নিতে চায়, তাহলে সেটি ইসরায়েল ও মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি এখনো পুরোপুরি ভেস্তে যায়নি। তবে আঞ্চলিক সংঘাত, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের কৌশলগত অবস্থান মিলিয়ে সমঝোতার পথ এখনো জটিল ও অনিশ্চিত রয়ে গেছে। ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তির বিষয়ে আশাবাদী থাকলেও বাস্তবে তা অর্জন করতে হলে ওয়াশিংটনকে তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ স্বার্থের কঠিন সমীকরণ মেলাতে হবে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এই শাখার আরও খবর

সেনা হত্যার পর পাহাড়জুড়ে সাঁড়াশি অভিযান, পড়ে আছে ৩ লাশ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  সেনাসদস্য হত্যার ঘটনার পর কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছে। এর মধ্যেই হ্নীলা ইউনিয়নের পাহাড়ে তিনজনের লাশ পড়ে…

ভারতের পাঞ্জাবে চলন্ত ট্রেনের একাধিক বগিতে আগুন

ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে চলন্ত একটি ট্রেনের তিন থেকে চারটি বগিতে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে আগুন ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্কিত যাত্রীরা দ্রুত ট্রেন…

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাজ্যে ভারতীয় নাবিক আটক, ১০ বছরের কারাদণ্ডের শঙ্কা

আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে রাশিয়ার তেলবাহী কথিত ‘শ্যাডো ফ্লিটের’ একটি জাহাজ জব্দ করে এর ভারতীয় ক্যাপ্টেনকে গ্রেপ্তার করেছে যুক্তরাজ্য। নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে জাহাজের ক্যাপ্টেন অজয় পান্তের…

ছিনতাইকারী ভেবে দুই পুলিশ সদস্যকে পেটালেন কুবি শিক্ষার্থীরা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  ছিনতাইকারী সন্দেহে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীরা দুই পুলিশ সদস্য ও পুলিশের এক সোর্সকে মারধর করে বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে গেছেন। পরে…

বিচ্ছেদের জল্পনায় জল! দীপাবলির পার্টিতে হাতে হাত রেখে হাজির অভিষেক-ঐশ্বরিয়া

দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের দাম্পত্য জীবন নিয়ে নানা জল্পনা বলিউডে। কখনও বিচ্ছেদের গুঞ্জন, কখনও পারিবারিক দূরত্বের খবর। তবে সব জল্পনাকে পিছনে ফেলে আবারও একসঙ্গে দেখা গেল…

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ধস, এক দিনেই উধাও আড়াই লাখ কোটি ডলার

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয়ের পর দেশটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর জেরে গতকাল বৃহস্পতিবার বড়…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au