মিরপুরে ফ্ল্যাটে বৃদ্ধার 'করুণ মৃত্যু' ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনা। ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৪ জুন- রাজধানীর মিরপুরে একটি ফ্ল্যাট থেকে সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধার পচনধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নূরজাহান বেগম নামে ওই বৃদ্ধার মৃত্যুকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকেই। উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত সন্তান থাকা সত্ত্বেও এমন পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু কীভাবে হলো, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে প্রণীত দেশের বিদ্যমান আইন এবং তার বাস্তব প্রয়োগের বিষয়টি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার রাজধানীর মিরপুর-৬ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কের একটি ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ দেখতে পায়, মরদেহে ইতোমধ্যে পচন ধরেছে এবং সেখান থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মৃত্যুর কয়েকদিন পর মরদেহটি উদ্ধার করা হয়েছে।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাসান বাসির জানান, ফ্ল্যাটটির অবস্থা ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। ঘরের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা জমে ছিল, মেঝে ছিল স্যাঁতসেঁতে এবং বহু জায়গায় ছত্রাক জন্মেছিল। এমনকি দুর্গন্ধ ও পরিবেশের কারণে পুলিশ সদস্যদেরও দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করতে কষ্ট হচ্ছিল।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নূরজাহান বেগমের সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁর এক ছেলে সরকারের একজন যুগ্মসচিব, আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং একমাত্র মেয়ে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করেন। বৃদ্ধা মূলত মেয়ের সঙ্গেই ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ফ্ল্যাটটি মূলত বৃদ্ধার মেয়ে ও তাঁর প্রয়াত স্বামীর মালিকানাধীন। মেয়ের স্বামী একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ছিলেন এবং কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান। তাদের কোনো সন্তান ছিল না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে মা ও মেয়ে একসঙ্গেই বসবাস করছিলেন।
ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মা-মেয়ে খুব একটা বাইরে বের হতেন না এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গেও মেলামেশা করতেন না। প্রয়োজন ছাড়া দরজাও খুলতেন না বলে জানিয়েছেন কয়েকজন বাসিন্দা।
ঘটনার দিন বৃদ্ধার কোনো সাড়া না পেয়ে তাঁর মেয়ে পাশের একটি ক্লিনিক থেকে দুইজন নার্সকে ডেকে আনেন। নার্সরা ঘরে প্রবেশ করে বৃদ্ধাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান এবং পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে বিষয়টি পুলিশকে জানান।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নিশ্চিত হয় যে, বৃদ্ধার মৃত্যু বেশ কয়েকদিন আগেই হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, মরদেহের বিভিন্ন অংশে পচন ধরেছিল এবং কিছু স্থানে পোকাও দেখা গিয়েছিল। পুরো ফ্ল্যাটের পরিবেশ এমন ছিল যে, সেখানে কোনো সুস্থ মানুষের স্বাভাবিকভাবে বসবাস করা কঠিন।
তদন্তের অংশ হিসেবে বৃদ্ধার মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তাঁর কথাবার্তায় অসংলগ্নতা লক্ষ্য করা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, তিনি মানসিকভাবে সুস্থ আছেন কি না, সেটিও এখন খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ, একই ঘরে বসবাস করেও মায়ের মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তিনি বুঝতে পারেননি বা যথাযথ ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
ময়নাতদন্ত শেষে নূরজাহান বেগমের মরদেহ তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ছেলের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে দাফনের জন্য মরদেহ চাঁদপুরে গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়।
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্ল্যাটের ভেতরের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, বৃদ্ধা যে কক্ষে বসবাস করতেন, সেটি অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় ছিল। এসব দৃশ্য দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ।
অনেকেই মনে করছেন, এমন পরিস্থিতিতে একজন বৃদ্ধার মৃত্যু শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয় নয়, বরং এটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ববোধেরও একটি প্রশ্ন। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, সন্তানদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই এমন মর্মান্তিক পরিণতি ঘটেছে।
এ ঘটনায় তদন্তের দাবিতে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদনও দায়ের করা হয়েছে। আইনজীবী শরীফ সরকার হাইকোর্টে করা ওই আবেদনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তদন্তের জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে অনুসন্ধানের নির্দেশনা চেয়েছেন।
এদিকে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট যুগ্মসচিবের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে তাঁকে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে সরকারি প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।
ঘটনার পর আবারও আলোচনায় এসেছে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’। বয়স্ক বাবা-মায়ের দায়িত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে এই আইন প্রণয়ন করে।
আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক সামর্থ্যবান ছেলে-মেয়ের দায়িত্ব হলো তাঁদের পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা। ভরণপোষণের মধ্যে শুধু খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানই নয়, চিকিৎসা, সেবা, মানসিক সঙ্গ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে তারা পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবেন বলেও আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন আরও বলছে, বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সন্তানদের তাঁদের সঙ্গে একই স্থানে বসবাস করতে হবে। পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁদের কোনো বৃদ্ধাশ্রম বা অন্যত্র থাকতে বাধ্য করা যাবে না।
যেসব সন্তান চাকরি, ব্যবসা বা অন্য কোনো কারণে দূরে থাকেন, তাঁদের নিয়মিত বাবা-মায়ের খোঁজখবর নেওয়া, দেখা-সাক্ষাৎ করা এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এ ছাড়া ছেলে-মেয়ে অনুপস্থিত থাকলে নাতি-নাতনিদেরও বৃদ্ধ দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানির দেখাশোনার দায়িত্ব পালনের কথা আইনে বলা হয়েছে।
এই আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে, কেউ যদি পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেন, তিনিও একই ধরনের শাস্তির আওতায় আসতে পারেন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, বাংলাদেশের পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এই আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি অনেকাংশে কমে আসবে।
মিরপুরের এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি সমাজে বয়স্ক মানুষদের নিরাপত্তা, সম্মান ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্তের ফলাফল কী আসে, সেটির দিকে এখন সবার নজর রয়েছে।