অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানি ।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৩ জুন- অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার সিরিয়ায় অবস্থানরত আইএস–সম্পৃক্ত নারীদের (আইএস ব্রাইড) দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রায় ১৫০টি সরকারি নথি প্রকাশ না করায় দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ তুলেছে, সরকার একদিকে এসব নারীর সঙ্গে যোগাযোগ বা সহায়তার বিষয়টি অস্বীকার করছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিপুলসংখ্যক নথি জনসমক্ষে আনতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের করা তথ্য অধিকার আইনের (এফওআই) এক আবেদনের জবাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে যে আইএস–সম্পৃক্ত নারীদের প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে প্রায় ১৫০টি নথি তাদের কাছে রয়েছে। তবে নথিগুলো প্রকাশ করতে গেলে বিভাগের সময় ও সম্পদের ওপর ‘অতিরিক্ত এবং অযৌক্তিক চাপ’ পড়বে উল্লেখ করে আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা হয়।
আবেদনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক, তার মন্ত্রণালয় এবং আইএস–সম্পৃক্ত নারীদের পক্ষে কাজ করা ব্যক্তি বা সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগসংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম কমিউনিটি নেতা জামাল রিফির সঙ্গে সরকারি যোগাযোগের বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়। যদিও নথিগুলোতে ঠিক কী রয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
বিষয়টি সামনে আসার পর বিরোধী জোটের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জনো ডুনিয়াম সরকারের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “সরকার যদি সত্যিই কিছু লুকানোর চেষ্টা না করে থাকে, তাহলে এসব নথি প্রকাশে আপত্তি থাকার কথা নয়। তারা একদিকে বলছে কোনো সহায়তা দেয়নি, অন্যদিকে একই বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত শতাধিক নথি গোপন রাখছে।”
এর আগে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ একাধিকবার দাবি করেছিলেন, তার সরকার কিংবা অস্ট্রেলিয়ান সরকারের কোনো সংস্থা আইএস–সম্পৃক্ত নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতেও কোনো ধরনের সহায়তা দেয়নি। তবে পরবর্তীতে জানা যায়, নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ এসব নারীর প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি সম্পর্কে আগে থেকেই অবহিত ছিল। এছাড়া তাদের কয়েকজনের জন্য অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্টও ইস্যু করা হয়েছিল।
বিতর্ক আরও বাড়ে যখন প্রকাশ পায় যে মুসলিম কমিউনিটি নেতা জামাল রিফি এসব নারীর পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহে ভূমিকা রেখেছিলেন। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক তার সঙ্গে মতপার্থক্যের কথা বলেছেন, তবে রিফির ভূমিকার নিন্দা করতে অস্বীকৃতি জানান।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে লেবার সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে অন্তত ১৬ জন আইএস–সম্পৃক্ত নারী সিরিয়া থেকে অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে এসেছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। সম্প্রতি মে মাসে দেশে ফেরা কয়েকজন নারীকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
এদিকে সরকারের তথ্য গোপনের অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে আইএস-সম্পৃক্ত নারীদের পাসপোর্ট ইস্যু ও নিরাপত্তা যাচাই–সংক্রান্ত নথি প্রকাশের আবেদনও প্রত্যাখ্যান করেছিল পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ। তাদের যুক্তি ছিল, এসব তথ্য প্রকাশ জনস্বার্থে নয় এবং এতে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা বলছে, অ্যালবানিজ সরকারের আমলে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা আবেদনের বড় অংশই আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ফলে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইএস-সম্পৃক্ত নারীদের প্রত্যাবর্তন ইস্যু আগামী দিনে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা, অভিবাসন নীতি এবং সরকারি স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। বিরোধীরা এখন এসব নথি প্রকাশের জন্য সরকারের ওপর আরও চাপ বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।