বিশ্ব

চাপে নেতানিয়াহু

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে যেভাবে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সংকটের মুখে ইসরায়েল

  • 4:06 pm - June 16, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৫৩ বার
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের সুপ্রিম লিডার মুজতবা খামেনি ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ছবিঃ বিবিসি

মেলবোর্ন, ১৬ জুন- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ অবসান এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণার পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেই নতুন সমীকরণ তৈরি করেনি, বরং নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তা কৌশল এবং নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম ভিত্তিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি হয়েছে এবং এর বিস্তারিত শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি এ ঘোষণা দেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আগামী শুক্রবার জেনেভায় চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল পুনরায় শুরু হবে।

তবে এই চুক্তি ইসরায়েলের জন্য বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ বহু বছর ধরে তিনি ইরানকে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি বানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক শক্তির তিনটি প্রধান স্তম্ভ ছিল ইরানবিরোধী অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং নিজেকে ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সাম্প্রতিক চুক্তি এই তিন ক্ষেত্রেই তাকে দুর্বল অবস্থানে নিয়ে গেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ছবি : সংগৃহীত

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারকারী এবং ওয়াশিংটনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত নেতানিয়াহুকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাল। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এটি নেতানিয়াহুর জন্য কূটনৈতিকভাবে বড় ধরনের ধাক্কা।

চুক্তির অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক কার্যক্রম বন্ধের উদ্যোগ। এতে ইসরায়েলের জন্য নতুন কৌশলগত সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে লেবাননে হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক চাপ বজায় রাখাকে ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে।

ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলো ইতোমধ্যে বিষয়টিকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে। দেশটির সংসদ নেসেটে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহু এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন যেখানে তার সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি, অন্যদিকে ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা।

ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন যে, বৈরুতে হামলার নির্দেশ দিয়ে নেতানিয়াহু সঠিক বিচক্ষণতার পরিচয় দেননি। এই মন্তব্য ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিরোধী দলগুলো ট্রাম্পের বক্তব্যকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ওপর অনাস্থার ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরছে।

নেতানিয়াহুর নিজস্ব রাজনৈতিক জোটের মধ্যেও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির প্রকাশ্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া কোনো চুক্তি ইসরায়েলকে বাধ্য করতে পারে না এবং দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সেই চুক্তির প্রতি ইসরায়েলের দায়বদ্ধতা নেই।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা সিমা শাইন মনে করেন, এই সমঝোতার ফলে লেবাননে হেজবুল্লাহর প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তার মতে, ইরানকে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত হেজবুল্লাহর রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার ঝুঁকি নিয়েছে।

অন্যদিকে নেতানিয়াহুর নীরবতাও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলোতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এবার তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন পরিস্থিতিতে কৌশল নির্ধারণে তিনি সময় নিচ্ছেন।

গাজা যুদ্ধের পর থেকে নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা নীতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ইসরায়েল ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনা করলেও হামাস পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বরং বিভিন্ন অঞ্চলে সংগঠনটির উপস্থিতি এখনও বজায় রয়েছে। একইভাবে লেবাননে হেজবুল্লাহ এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবও পুরোপুরি কমানো সম্ভব হয়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসমাইল বাঘাই। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান ইসরায়েলের অর্থনীতি, সেনাবাহিনী এবং রিজার্ভ বাহিনীর ওপরও চাপ তৈরি করেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইসরায়েলকে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।

ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি ইসরায়েলের ইরাননীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। তার মতে, বাস্তবসম্মত ও সংযত কৌশল গ্রহণ ছাড়া ভবিষ্যতে আরও বড় কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ওয়াশিংটন যদি মনে করে ইসরায়েলের কোনো পদক্ষেপ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। ফলে আগের মতো মার্কিন প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ করাও নেতানিয়াহুর জন্য সহজ হবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার যে কৌশল নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন অনুসরণ করেছেন, বর্তমান চুক্তি সেই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন কিংবা তেহরানের প্রভাব কমিয়ে আনার পরিবর্তে এখন মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণে ইরানকে আগের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী অবস্থানে দেখা যাচ্ছে।

ফলে আসন্ন নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও নিরাপত্তা নীতির যৌক্তিকতা জনগণের কাছে তুলে ধরা। মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতায় তিনি কী পথ বেছে নেন, তা শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।

সূত্রঃ বিবিসি

এই শাখার আরও খবর

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

আরজি করের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও তৃণমূল…

ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, তারেকের সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, কিংবা তিনি অংশ না নিলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন…

বিএনপি নেতাদের অভিনন্দন জানালেন ৩ উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তত তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au