আওয়ামী লীগের ৭৭ বছর: রূপান্তরের যে উত্তরাধিকারকে উপেক্ষা করতে পারে না বিশ্ব
মেলবোর্ন, ২৩ জুন- প্রতিষ্ঠার ৭৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক যাত্রা এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে দলটির ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশের…
মেলবোর্ন, ২৩ জুন- উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশে গিয়েও নির্ধারিত সময় শেষে কর্মস্থলে ফিরে আসেননি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অন্তত ২৪ জন শিক্ষক। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী শিক্ষাছুটিকালে প্রাপ্ত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও তারা ফেরত দেননি। ফলে এসব শিক্ষকের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকারও বেশি। বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মাস্টার্স, পিএইচডি এবং পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার জন্য গিয়েছিলেন এসব শিক্ষক। তবে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পর অনেকেই আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেননি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ও কর্মসংস্থান বিধিমালা অনুযায়ী, বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে শিক্ষকদের ৩০ দিনের মধ্যে নিজ পদে যোগদান করতে হয়। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানকালের অতিরিক্ত অন্তত তিন বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কোনো শিক্ষক এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে শিক্ষাছুটিকালে প্রাপ্ত বেতন-ভাতা ব্যাংকের প্রচলিত সুদসহ এককালীন ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচিং সেকশনের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. রেজাউল কবির জানান, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকজনকে অবসরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদের অধিকাংশকে তাদের আবেদনের ভিত্তিতে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আবার কয়েকজনকে বরখাস্তও করা হয়েছে। শিক্ষাছুটিতে যাওয়ার তারিখ থেকেই এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ শিক্ষককে সিন্ডিকেটের অনুমোদনের মাধ্যমে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে প্রশাসনের একাধিক নোটিশ ও ব্যাখ্যা চাওয়ার পরও সাড়া না দেওয়ায় কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বকেয়া অর্থ ফেরত এবং ব্যাখ্যা চেয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের স্থায়ী ঠিকানায় একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ই-মেইলেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু অনেকেই কোনো জবাব দেননি।
বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সম্প্রতি সক্রিয় হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম আবদুর রব জানান, গত ২১ মে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষাছুটি-সংক্রান্ত অনিয়ম তদন্তে উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মো. শামসুল আলমের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হবে। বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৯ মে পর্যন্ত পাওনার পরিমাণ ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি বকেয়া রয়েছে মাত্র ছয়জন সাবেক শিক্ষকের কাছে।
সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে দর্শন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ ফয়সাল জামালের কাছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে তার কাছে পাওনা ৪৮ লাখ ৮৬ হাজার ১৮০ টাকা। ২০১৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মাস্টার্স করতে যান এবং পরে পিএইচডির জন্য ছুটির মেয়াদ বাড়ান। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তা জানান, ২০২২ সালে দেশে ফিরে তিনি কিছুদিন কাজ করার পর স্বেচ্ছা অবসরের আবেদন করে আবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।
তবে ফয়সাল জামাল দাবি করেন, তিনি দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলেন এবং কিছুদিন দায়িত্বও পালন করেছেন। পরবর্তীতে অবসরের আবেদন করার সময় পেনশন ও গ্র্যাচুইটির অর্থের সঙ্গে বকেয়া সমন্বয়ের সুযোগ চাইলেও তা মঞ্জুর হয়নি।
হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থা বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক প্রবাল দত্তের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা ৪৮ লাখ ৫২ হাজার ১৭ টাকা। বর্তমানে তিনি ফিনল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরাল গবেষক হিসেবে কর্মরত। তিনি জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর যোগ দেননি এবং দেশে ফিরে বকেয়া অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নেবেন।
পরিসংখ্যান ও ডেটা সায়েন্স বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. তারেক ফেরদৌস খানের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি ৪৪ লাখ ৯ হাজার ৩২৬ টাকা। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। ই-মেইলে তিনি জানিয়েছেন, এখনও পুরো অর্থের ব্যবস্থা করতে পারেননি, তবে দ্রুত পরিশোধের চেষ্টা করছেন।
একই বিভাগের আরেক সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আজিজুর রহমানের কাছে পাওনা ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৫৭১ টাকা। তিনি জানিয়েছেন, বকেয়া পরিশোধের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে যৌক্তিক সময়সীমা চেয়েছেন এবং বিষয়টির সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক নওরীন তাবাসসুমের ঘটনাও আলোচনায় রয়েছে। কানাডায় উচ্চশিক্ষার জন্য একাধিকবার ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হলেও তিনি আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরেননি। বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করায় তার জামিনদার অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের গ্র্যাচুইটি তহবিল থেকে প্রায় ১৪ লাখ টাকা আটকে রাখা হয়েছে। এরপরও নওরীনের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা রয়েছে ১৬ লাখ টাকার বেশি।
অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, তিনি একাধিকবার নওরীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তার সঙ্গে যোগাযোগে ব্যর্থ হয়েছে।
এদিকে গণিত বিভাগের সাবেক শিক্ষক এ কে এম ফজলুর রহমানের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৫২২ টাকা। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহামে কর্মরত। তবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দাবি করেছেন, প্রকৃত পাওনার তুলনায় অনেক বেশি অর্থ দেখানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পট্রোলার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে সুদ যুক্ত হওয়ায় বকেয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে না ফেরা এবং পাওনা অর্থ পরিশোধ না করা শিক্ষকদের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অনৈতিক আচরণ। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে শর্ত ভঙ্গ করা দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মাফরুহী সাত্তার বলেন, বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করা নিঃসন্দেহে অনৈতিক। তবে দেশে অনেক সময় উপযুক্ত গবেষণা ও কর্মপরিবেশের অভাবও শিক্ষকদের ফিরে না আসার একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া শিক্ষকদের নৈতিক দায়িত্ব হলো দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নে অবদান রাখা। কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে অন্তত জনগণের অর্থ জনগণকে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে বকেয়া অর্থ আদায়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au