মেলবোর্ন,১ জুলাই- দেশ মানে শুধু মাটি না। দেশ মানে মানুষ। আর মানুষের দেশ চালাবে মানুষের প্রতিনিধি। একেই বলে গণতন্ত্র। বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে, “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ”।
কিন্তু আজ প্রশ্ন: দেশ কি আসলেই জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে? নাকি কলমের কালিতে, ফাইলের ভাঁজে?
একসময় রাজনীতি ছিল ব্রত। নম্র, ভদ্র, শিক্ষিত মানুষ সমাজ, গ্রাম, পরিবেশের জন্য রাজনীতিতে আসতেন। ১৯৭৫ সালের পর থেকে সেই রাজনীতির সম্মান হারিয়ে গেছে। এখন রাজনীতি মানে ব্যক্তিস্বার্থ, টাকা, টেন্ডার আর ক্ষমতা।
আর এই শূন্যতার জায়গা দখল করেছে আমলাতন্ত্র। ফলে আমরা হয়ে পড়েছি “আমলা নির্ভর”। আর আমলা নির্ভর হওয়া মানেই সর্বনাশ।
তাই আজকের দাবি একটাই: গদি না, সেবা। রাজনীতি ফেরাতে হবে।
১. রাজনীতির পতন: আদর্শের জায়গায় ধান্ধা
আমাদের রাজনীতির ইতিহাস গৌরবের। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ – সবই রাজনীতিকদের নেতৃত্বে হয়েছে। তখনকার নেতারা গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন। তরুণদের সাথে বসে গল্প করতেন।
কিন্তু ধীরে ধীরে ছবিটা বদলে গেল।
প্রথমত, অপরাধীদের প্রবেশ। টিআইবি ২০২৩: স্থানীয় নির্বাচনে ৪২% প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা। মাস্তান, টেন্ডারবাজ, ভূমিদস্যু টাকা দিয়ে দলে ঢুকছে।
দ্বিতীয়ত, নমিনেশন বাণিজ্য।সিপিডি ২০১৮: ৬৪% প্রার্থী স্বীকার করেছেন মনোনয়ন পেতে গড়ে ১.৫ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে। ফলে কালোবাজারির হাতে দলের টিকেট।
তৃতীয়ত, কর্মীর অবমূল্যায়ন। ব্র্যাক ২০২: ৭৮% তৃণমূল কর্মী মনে করে “আমাদের কথা কেউ শোনে না”। নেতা আসেন হাজিরা দেখতে। টাকা দিয়ে লোক ভাড়া হয়।
চতুর্থত, নৈতিকতার মৃত্যু। নিজ দলে কেউ উঠে আসলে হেয় করা, মিথ্যা অপবাদ। ইউজিসি ২০২৪: ৬১% তরুণ বলে “আদর্শ নাই, তাই রাজনীতিতে আসব না”।
ফল: “কেউ কারোর নয়। সবাই একা। সবাই টাকার পেছনে”।
২. আমলাতন্ত্রের উত্থান: রাজনীতিকের জায়গা দখল
রাজনীতিক যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়, সেই জায়গা দখল করে আমলা।
সংবিধান বনাম বাস্তবতা: সংবিধানের ৭ নং অনুচ্ছেদ বলে ক্ষমতার মালিক জনগণ। বাস্তবে ক্ষমতা সচিবালয়ের ফাইলে।
তিনটি উপাত্ত:
এক. ২০২০-২১ সালে জেলায় সচিবদের সমন্বয়ক করায় সংসদে বলা হয়, “রাজনীতিবিদেরা তৃতীয় লাইনে”।
দুই. অর্থ মন্ত্রণালয় ২০২৩-২৪: উন্নয়ন বাজেটের ৮৭% প্রকল্প সচিব পর্যায়ে অনুমোদন। এমপির কাজ প্রস্তাব পর্যন্ত।
তিন. এলজিআরডি ২০২৩: ৩৮০টি উপজেলায় ইউএনও-এর অনুমতি ছাড়া চেয়ারম্যান ৫ লাখ টাকাও খরচ করতে পারেন না।
কেন? রাজনীতিক আস্থা হারিয়েছে। আমলা “অব্যয় অক্ষয়”। রাজনীতিক গদি বাঁচাতে আমলাকে ব্যবহার করে। আমলাও সুযোগ নেয়।
ফল: “রাজনীতিক আজ আছে কাল নেই। আমলা চিরস্থায়ী”।
৩. আমলা নির্ভরতা কেন সর্বনাশ? পাঁচটি কারণ
এক. সেবা নাই, সাহেব আছে। টিআইবি ২০২: ভূমি অফিসে ৭৩% ঘুষ, পাসপোর্টে ৬৮% দাল, ব্যাংকে ৫৪% খারাপ ব্যবহার।
দুই. “স্যার” সংস্কৃতি। পাকিস্তান আমলের “সাহেব” কালচার এখনো আছে। সেবক-জনতার দূরত্ব বেড়েছে।
তিন. জবাবদিহিতা নাই। পিএসি ২০২: বছরে মাত্র 0.3% কর্মকর্তার শাস্তি। বেসরকারিতে ১২% চাকরি যায়।
চার. জনবিচ্ছিন্ন নীতি। শিক্ষানীতি, ভূমি আইনের ৯৫% খসড়া আমলা করেন। গ্রামের কথা ৫%।
পাঁচ. দুর্নীতির আখড়া। টিআইবি ২০২৩: দুর্নীতির শীর্ষ তিন খাত আইনশৃঙ্খলা ৭১%, ভূমি ৬৮%, বিচার ৫৯%। সবই আমলা নির্ভর।
৪. ব্যবসায়ী রাজনীতি: তৃতীয় সর্বনাশ
সংসদ সচিবালয়: একাদশ সংসদের ৫৪% এমপি ব্যবসায়ী। ফলে সবকিছুতে ব্যবসা। অর্থ + পেশীশক্তি = রাজনীতির নিয়ামক। গদি মানে বিনিয়োগ।
৫. সমাধান: রাজনীতি ফেরানোর নয় দফা*
এক.ন্যূনতম এইচএসি + সংবিধান-ইতিহাস প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক।
দুই. কেন্দ্রীয় নেতা বছরে ৪ বার তৃণমূলের সাথে বসবে।
তিন.ইসির “মনোনয়ন স্বচ্ছতা সেল”। টাকার বিনিময় প্রমাণিত হলে বাতিল।
চার. ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ: ইউপি ৫০ লাখ, উপজেলা ১০ কোটি, জেলা ৩০ কোটি।
পাঁচ. প্রতি অফিসে “সেবক সূচক”। জনগণের মার্ক 2.5 এর নিচে হলে পদোন্নতি বন্ধ।
ছয়. “স্যার” বাদ। সবাইকে “জনাব” বলতে হবে।
সাত. দণ্ডপ্রাপ্ত, ঋণখেলাপির রাজনীতি নিষিদ্ধ।
আট. সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ। প্রতি জেলায় “তরুণ পার্লামেন্ট”।
নয়. মাসে ২টি বই, বছরে ৪টি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক।
আমরা বাঙালি। ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃষ্টি-সংস্কৃতি আমাদের গর্ব। মানবতা, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম দিয়ে আমরা উন্নত জাতি হবো।
পরিশেষে একটি বাস্তব শিক্ষার কথা বলতে হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকার ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, শতভাগ বিদ্যুতায়ন – এইসব মেগা প্রকল্প বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক ২০২৩ সালে বাংলাদেশকে “নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ” থেকে “উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ” হওয়ার পথে বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
কিন্তু এই অর্জন সত্ত্বেও একটি বড় ঘাটতি থেকে গেছে।
প্রথম ঘাটতি: আমলাতন্ত্রের কারণে সাধারণ মানুষের আসল বার্তা সরকার প্রধানের কাছে পৌঁছায়নি। মাঠ পর্যায়ে চাল-ডালের দাম, বাজারের কষ্ট, কর্মীর ক্ষোভ – এই তথ্যগুলো ফাইলে আটকে গেছে।
দ্বিতীয় ঘাটতি: অতিরিক্ত আমলা ও গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নির্ভরশীলতার কারণে সঠিক, নিরপেক্ষ তথ্য সরকার প্রধান পাননি। রাজনৈতিক দলের তৃণমূলের সাথে যোগাযোগের সেতু ভেঙে গিয়েছিল।
ফলাফল: তথ্যের এই ঘাটতি এবং জনবিচ্ছিন্নতার কারণেই সরকারের পতন ঘটেছে।
এই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। আগামীতে রাজনীতি ও সরকার পরিচালনায় আমলা নির্ভর না হয়ে, জনগণ নির্ভর হতে হবে। তৃণমূলের কর্মীর কথা শুনতে হবে। মাঠের বাস্তবতা বুঝতে হবে। ফাইলের তথ্য না, মানুষের মুখের কথা হবে নীতির উৎস।
সুশাসন মানে আমলার ফাইল না, জনগণের মুখ। গণতন্ত্র মানে সচিবালয় না, গ্রামের সালিশ।
তাই প্রান্তজনের শেষ কথা:
গদি না, সেবা চাই।
আমলা না, মানুষ চাই।
ধান্ধাবাজ না, দেশপ্রেমিক চাই।
এই শিক্ষা থেকে সঠিক পথ বেছে নিতে পারলেই বাংলাদেশ হবে সত্যিকারের মানুষের বাংলাদেশ।