‘মব রাজনীতির’ বিতর্কে হাসনাত আবদুল্লাহ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৪ জুলাই- জুলাই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি আসার পর তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক আচরণ এবং কথিত ‘মব সংস্কৃতি’কে উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে।
সম্প্রতি লন্ডন সফর শেষে দেশে ফেরার পর সংসদে তাঁর বক্তব্য এবং রাজনৈতিক অবস্থান আবারও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর আগে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে তাঁকে ঘিরে একটি ‘মব’ সংশ্লিষ্ট বিতর্কের খবরও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই আন্দোলনের সময় হাসনাত আবদুল্লাহর নেতৃত্ব, উদ্যম ও সাংগঠনিক দক্ষতা বহু শিক্ষার্থীকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করেছিল। আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলনের একটি রাজনৈতিক পরিণতি এলেও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।
সমালোচকদের দাবি, যে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ব্যক্তি স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, বৈষম্যহীন সমাজ এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, পরবর্তীকালে সেই আদর্শ থেকে সরে এসে ভিন্নমতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ক্রমেই সংঘাতমুখী ও মুখোমুখি অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিক, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, শিল্পী, বাউলশিল্পী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধেও অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়ার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনী সম্পর্কেও কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্য করেছেন তিনি, যদিও সংকটময় পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীই তাঁকে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, কারও বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যে কঠোর হুঁশিয়ারি ও চাপ সৃষ্টির প্রবণতা দেখা যায়। এতে সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত জনসমর্থন পরবর্তীকালে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, একজন সম্ভাবনাময় তরুণ নেতা হিসেবে তাঁর যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল, ক্ষমতার কাছাকাছি আসার পর তা ক্ষুণ্ন হয়েছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, তিনি নিজের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন এবং এর মাধ্যমে দেশে ‘মব রাজনীতি’কে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা হাসনাত আবদুল্লাহ পরবর্তীকালে বিলাসী জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণ, বিলাসবহুল গাড়ির প্রতি আগ্রহ এবং বড় অঙ্কের সরকারি বরাদ্দে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
কুমিল্লা জেলা পরিষদের ২৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ বণ্টনে হাসনাত আবদুল্লাহ ও এনসিপির আরেক নেতা আসিফের প্রভাব ছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যদিও এ অভিযোগেরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্য হওয়ার পরও তিনি কথিত ‘মব রাজনীতি’ থেকে সরে আসেননি। বরং বিরোধীদের চাপে রাখতে জনসমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সংসদের কার্যক্রমেও আন্দোলনের রাজনীতির ধারা নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন বলেও সমালোচকরা দাবি করছেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তাঁর বিলাসবহুল জীবনযাপন বা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়েছে। এমনকি কিছু সাংবাদিককে চাকরি হারানোর জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সমালোচকদের মতে, ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ‘আওয়ামী সহযোগী’, ‘ভারতের এজেন্ট’ বা ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা রাজনৈতিক ভীতি সৃষ্টির একটি কৌশলে পরিণত হয়েছে। এর ফলে বিরোধী মতের মানুষ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের একাংশের দাবি, বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক শাস্তি বা সামাজিক চাপ তৈরির প্রবণতা আইনের শাসনের জন্য হুমকি। তাঁদের মতে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগও ‘মব সংস্কৃতি’কে উৎসাহিত করছে।
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, একদিকে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিলেও অন্যদিকে বিতর্কিত কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে গোপন সমঝোতার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সমালোচকদের মতে, এটি দ্বৈত রাজনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করে।
প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে তোলা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, বিভিন্ন স্থানে মব সহিংসতার অভিযোগ উঠলেও সরকার অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এর ফলে এমন একটি বার্তা গেছে যে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রতি প্রশাসনের নীরব সমর্থন রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হওয়ায় হাসনাত আবদুল্লাহ ও তাঁর অনুসারীরা কার্যত জবাবদিহির বাইরে অবস্থান করেছেন। এই পরিস্থিতি তাঁদের আরও আত্মবিশ্বাসী এবং অনেক ক্ষেত্রে বেপরোয়া করে তুলেছে বলে সমালোচকরা মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য তিনটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে। প্রথমত, এটি সমাজে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে, যেখানে যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে সংঘাত ও আক্রমণাত্মক আচরণ প্রাধান্য পায়। দ্বিতীয়ত, আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। তৃতীয়ত, জুলাই আন্দোলনের সময় যাঁরা আন্দোলনের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছিলেন, তাঁদের একটি অংশের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
প্রতিবেদনে উপসংহারে দাবি করা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনের সময় কর্তৃত্ববাদবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত হলেও বর্তমানে হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে সেই ক্ষমতাকেই ভিন্নমত দমনে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলায় কথিত ‘মব সংস্কৃতি’কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগই তাঁকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের মূল কারণ।
সূত্রঃ ডেইলি সান