মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য গ্রেস মেং। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৪ জুলাই- মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য গ্রেস মেং বলেছেন, কোনো দেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা উদ্বেগের বিষয় এবং এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে। তিনি মনে করেন, কোনো ব্যক্তি আইন ভঙ্গ করলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তবে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশ, প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের অধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অভিবাসন নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বিচার ও জবাবদিহির মাধ্যমে তা সমাধান করা উচিত, তবে পুরো একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে।
কুইন্সের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা থেকে নির্বাচিত এই ডেমোক্রেটিক পার্টির নেত্রী দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশ বিষয়ক অনানুষ্ঠানিক সংসদীয় প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, বাংলাদেশি আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং অভিবাসীরা দেশটির ইতিহাস ও অগ্রগতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের অভিবাসন নীতি এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর কঠোর অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অভিবাসীদের ভয়ভীতির মধ্যে রাখা মানবিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে যেসব অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, তাতে অনেক সময় পরিশ্রমী ও আইন মেনে চলা মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানান এবং সংস্থাটির জবাবদিহি বাড়াতে নতুন আইন প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, সংস্থার কর্মকর্তাদের পরিচয় দৃশ্যমান রাখা, বলপ্রয়োগের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ এবং নিয়মিত চেক-ইনের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা চালুর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। এতে বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা, আবেদন নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত অভিবাসীদের বৈধভাবে কাজ ও বসবাসের সুযোগ তৈরির বিষয় থাকা উচিত বলে তিনি মত দেন।
তিনি আরও বলেন, কংগ্রেসে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে কার্যকর সংস্কার আটকে আছে। তার মতে, অভিবাসন সমস্যার মানবিক ও কার্যকর সমাধানে দ্বিদলীয় সহযোগিতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশি আমেরিকানদের নিয়ে গঠিত কংগ্রেশনাল বাংলাদেশ ককাস পুনরায় সক্রিয় করার বিষয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই প্ল্যাটফর্ম যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশি আমেরিকান সম্প্রদায় নিয়ে মূল্যায়নে তিনি বলেন, শুরু থেকেই তিনি এই সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন এবং তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করে আসছেন। তিনি বিভিন্ন কমিউনিটি ইভেন্টে নিয়মিত অংশগ্রহণের কথাও উল্লেখ করেন এবং বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারা তার জন্য গর্বের বিষয়।
তিনি জানান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে ফেডারেল ছুটি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ এবং ধর্মীয় ও সামাজিক সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় আইন প্রণয়নে তিনি কাজ করছেন।
এছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা জোরদার, মসজিদ ও অলাভজনক সংগঠনগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ঘৃণাজনিত অপরাধ প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের বিষয়েও তিনি কাজ করছেন বলে জানান। তিনি এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে একটি জাতীয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানবাধিকার কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি একটি সার্বজনীন মূল্যবোধ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে বলে জানান।
তিনি বলেন, যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর হওয়া উচিত। তার মতে, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বজায় রাখার মাধ্যমেই দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে।
আসন্ন মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে অভিবাসন সংস্কার, প্রশাসনিক তদারকি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ আরও জোরদার হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।