উগ্র মৌলবাদ ও নারী: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট- ইতিহাস কখনো কখনো নিজের সন্তানদের গিলে খায়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে আন্দোলন জন্ম নিয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে, নারীর সমান অংশগ্রহণের দাবিতে, সেই…
মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট- সভ্যতার চাকা ঘোরে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি দিয়ে। কিন্তু সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখে শিল্প-সাহিত্য। একটা জাতিকে অস্ত্র দিয়ে দমানো যায়, কিন্তু তার গান, নাটক, কবিতা কেড়ে নিলে সে জাতি নিঃশেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশের শেকড় আছে ৬৮ হাজার গ্রামে। আর সেই গ্রামের প্রাণ হলো মঞ্চায়ন, যাত্রা, লোকগান। আজ যখন আমরা “স্মার্ট বাংলাদেশ” এর স্বপ্ন দেখি, তখন প্রশ্ন আসে—শিল্প না থাকলে স্মার্ট হবে কে?
বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের ফসল। নদী-মাটি-মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা এই শিল্প-সাহিত্যই আমাদের জাতীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যের ধারা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়।
প্রথমেই আসে নাটক ও যাত্রার কথা। একসময় গ্রামে গ্রামে রাতভর চলত মঞ্চায়ন। বাঁশের মাচা, কুপির আলো, আর ঢোল-করতালের শব্দে মুখরিত হতো পুরো পাড়া। পালাগান, কীর্তন, কবিগান ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নগর জীবনে এর বিকাশ ঘটে আধুনিক নাটকের মাধ্যমে। জহির রায়হান, সেলিম আল দীন, মুনীর চৌধুরীর মতো নাট্যকাররা নাটককে করে তোলেন প্রতিবাদ ও চেতনার হাতিয়ার। “কবর”, “বহুব্রীহি”, “সাক্ষাৎকার” এর মতো নাটক আজও আমাদের ভাবায়। সমসাময়িক নাট্যকারদের মধ্যে জনপ্রিয় সৈয়দ মাসুম রেজা অন্যতম। তাঁর নাটক মানুষকে ভাবায়, কাদায়,আনন্দ দেয়।
এরপরই আসে চলচ্চিত্র। বাংলা সিনেমা মানেই ছিল গ্রামের গল্প, মানুষের গল্প। “মুখ ও মুখোশ” দিয়ে যে যাত্রা শুরু, “জীবন থেকে নেয়া”, “হাজার বছর ধরে”, “ঘুড্ডি” সেই ধারাকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমাগুলো আমাদের জাতীয় চেতনাকে শক্তিশালী করেছে।
আবৃত্তি ও নৃত্য আমাদের আবেগ প্রকাশের আরেকটি মাধ্যম। শম্ভু মিত্র, কাজী সাব্যাসাচী, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে আবৃত্তি হয়ে উঠেছিল বিপ্লবের মন্ত্র। অন্যদিকে কত্থক, মণিপুরী, লোকনৃত্য আমাদের শরীরের ভাষায় ফুটিয়ে তোলে বাংলার রূপ-রস-গন্ধ।
কিন্তু বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যের প্রাণ হলো লোকসঙ্গীত। এটি মাটির গান, মানুষের গান। নদীতে নৌকা বাইতে বাইতে মাঝি গায় ভাটিয়ালি। মাঠে ধান কাটতে কাটতে কৃষক গায় সারি গান। উত্তরবঙ্গের মানুষের বিরহের কথা বলে ভাওয়াইয়া। আধ্যাত্মিক সাধনার কথা বলে মুর্শিদী ও লালনগীতি। দুই দলের কবির বাকযুদ্ধ হলো কবিগান। গ্রামের উৎসবে শোনা যায় জারি গান। আর গ্রামের সুখ-দুঃখের কথা হলো পল্লীগীতি। লালনের “সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে” গানটি আজও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের দর্শন বহন করে।
এছাড়াও রয়েছে সাহিত্য ও কারুশিল্প। নজরুল, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমানের কবিতা, শরৎচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস আমাদের মন গঠন করেছে। নকশীকাঁথা, মাটির পুতুল, বাঁশ-বেতের কাজ—এগুলো শুধু শিল্প নয়, এগুলো আমাদের জীবনযাত্রার দলিল।
অর্থাৎ বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য একদিকে যেমন গভীরভাবে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে তেমনি আধুনিক চেতনাকেও ধারণ করে। এই সমন্বয়ই আমাদের শিল্প-সাহিত্যকে করেছে অনন্য।
বিবর্তন: আগে গ্রামে যা হতো, এখন কী হচ্ছে
এক সময় বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম ছিল একেকটি সাংস্কৃতিক পীঠস্থান। ফসল কাটার পর পৌষ মাসে বসত “পৌষ মেলা”। বৈশাখের প্রথম দিনে পুরো গ্রাম মিলে “হালখাতা” আর “নববর্ষের নাটক” করত। রাত জেগে চলত মঞ্চায়ন। বাঁশের মাচা বেঁধে, কুপি-হারিকেন জ্বালিয়ে সারা রাত যাত্রাপালা। “কেচ্ছা”, “লাইলী-মজনু”, “জমিদার-প্রজা”র পালা শুনতে পাশের ৫ গ্রামের মানুষ ছুটে আসত।
শীতের রাতে উঠানে বসত “কবিগানের আসর”। দুই দলের কবি বুদ্ধি দিয়ে লড়াই করত। নদীর পাড়ে মাঝিরা ধরত “ভাটিয়ালি”। মাঠে কাজের ফাঁকে নারীরা গাইত “পল্লীগীতি” আর “সারি গান”। বাউল-ফকির গাইত “লালন” আর “মুর্শিদী”। বিয়েতে, গায়ে হলুদে বাজত “ঢোল-তবলা-বাঁশি”। স্কুলের মাঠে শিক্ষক নিজে আবৃত্তি শেখাতেন।
কিন্তু বিবর্তনের নামে আমরা সব হারিয়েছি। টিভি আসার পর যাত্রা মরল। ডিশ-ইন্টারনেট আসার পর নাটক মরল। ইউটিউব-টিকটক আসার পর লোকগান মরল। এখন গ্রামের মঞ্চে ধুলা। মঞ্চায়নের বাঁশ পচে গেছে। শিল্পী ভিক্ষা করে। যুবক “রিলস” বানায়। আমরা প্রযুক্তি পেয়েছি, কিন্তু প্রাণ হারিয়েছি। গ্রাম এখন “ঘুমন্ত শহর”।
বর্তমান সংকট: ৩টি প্রধান কারণ
প্রথমত: গ্রামীণ শিল্পের মৃত্যু
আগে প্রতিটি গ্রামে বৈশাখে, পৌষে নাটক-যাত্রা হতো। এখন সেই মঞ্চ ভেঙে গেছে। স্পনসর নেই, দর্শক নেই। যুবসমাজ মোবাইল আর ইউটিউবে বন্দি।
দ্বিতীয়ত: বাণিজ্যিকীকরণ ও বিদেশি আগ্রাসন-
সিনেমা হল দখল করেছে বিদেশি সিনেমা। টিভিতে নাটকের নামে চলছে “কিচেন পলিটিক্স”। লালন, নজরুল, ভাটিয়ালি পাঠ্যপুস্তকের বাইরে চলে গেছে।
তৃতীয়ত: রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবহেলা
শিল্পী না খেয়ে মরে। ভাতা ৩ হাজার টাকা। স্কুলে আবৃত্তি-নৃত্য “অতিরিক্ত বিষয়”। বাবা-মা সন্তানকে বলে “এগুলো করে পেট চলবে?”
শিল্প হারালে জাতির ক্ষতি
১. পরিচয় সংকট: জারি-সারি, মঞ্চায়ন না থাকলে আমরা “বাঙালি” থাকব কীভাবে?
২. অর্থনৈতিক ক্ষতি: কোরিয়া K-Pop দিয়ে বছরে ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করে। আমাদের লালন, জামদানি, লোকনাট্য হতে পারত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস।
৩. নৈতিক অবক্ষয় : শিল্প মানুষের বিবেক জাগায়। শিল্প না থাকলে সমাজে বাড়ে মাদক, সহিংসতা ও হতাশা।
সমাধান: শিল্প পুনরুদ্ধারের ৫ দফা
দফা ১: “প্রতি ইউনিয়নে ১টি মঞ্চ” প্রকল্প
সরকারি বাজেটে প্রতিটি ইউনিয়নে স্থায়ী মঞ্চ ও “মঞ্চায়ন কেন্দ্র”। প্রতি মাসে নাটক ও লোকগানের আয়োজন বাধ্যতামূলক। শিল্পীকে মাসে ১৫ হাজার ভাতা দেওয়া।
দফা ২: শিক্ষায় শিল্প বাধ্যতামূলক
ক্লাস ৩ থেকে ১০ পর্যন্ত আবৃত্তি, নৃত্য, লোকগান পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত। প্রতি স্কুলে ১টি “সাংস্কৃতিক ক্লাব”।
দফা ৩: “এক জেলা এক শিল্প” ব্র্যান্ডিং
কুষ্টিয়া = লালন, রংপুর = ভাওয়াইয়া, ময়মনসিংহ = পল্লীগীতি। GI সনদ দিয়ে বিশ্ববাজারে প্রচার।
দফা ৪: গণমাধ্যমে কোটা ব্যবস্থা
সরকারি-বেসরকারি টিভি-রেডিওতে ৪০% সময় দেশি নাটক, সিনেমা ও লোকগানের জন্য বরাদ্দ।
দফা ৫: “ডিজিটাল শিল্প ব্যাংক” প্রতিষ্ঠা
দেশের সব লোকশিল্পী, নাটক, গান ভিডিও আকারে সংরক্ষণ। শিল্পীদের জন্য ক্রাউডফান্ডিং ও অনলাইন মার্কেটপ্লেস।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে বলি :
১৯৭১ সালে গণসংগীত ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা। “চল চল” গান শুনে মানুষ বন্দুক হাতে নিয়েছে। আজ সেই শিল্পকে আমরা অবহেলা করছি। যে রাষ্ট্র শিল্পীকে সম্মান দেয় না, সে রাষ্ট্র বেশিদিন টিকে না।
সামাজিক বিশ্লেষক হিসেবে বলি:
আগে দাদা নাতিকে ভাটিয়ালি শোনাত। এখন মোবাইলে গেম। আগে পাড়ার ছেলেরা মিলে নাটক করত। এখন TikTok-এ লিপসিং। আমরা “বিনোদন” কিনছি, কিন্তু “অভিজ্ঞতা” হারাচ্ছি। শিল্প ছাড়া মানুষ রোবটে পরিণত হবে।ক
উন্নয়নের জন্য ব্রিজ-ফ্লাইওভার দরকার। কিন্তু ব্রিজের উপর দিয়ে যে মানুষ হাঁটবে, তার মনে যদি গান না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন অর্থহীন।
শিল্প বিলাসিতা নয়, শিল্প নিঃশ্বাস।
মঞ্চ বাঁচলে নাটক বাঁচে। নাটক বাঁচলে জাতি বাঁচে।
আসুন, শপথ করি—আবার গ্রামে গ্রামে ঢোল বাজবে, আবার মঞ্চায়ন হবে, আবার আমরা লালন গাইব।
কারণ শিল্প না থাকলে জাতি থাকে না। আর জাতি না থাকলে বাংলাদেশও থাকে না।

সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত
লেখক- সরদার সেলিম রেজা
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au