প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মেলবোর্ন, ১৭ আগষ্ট- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সাক্ষাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর দিল্লি ফিরে যাওয়া এবং পরদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনে দিল্লির আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সময়ে ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনও ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী যেদিন তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, সেদিনই পরাগ জৈন ঢাকায় ছিলেন।
এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যার মাত্র কয়েক দিন আগে ভারতের দিল্লিতে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বহুল আলোচিত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। গত ৫ আগস্ট ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ঢাকার পক্ষ থেকে আগেই সতর্ক করা হলেও অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
তবে ওই ঘটনায় ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত। দিল্লি স্পষ্ট করে জানায়, অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছিল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল আরও জানান, বাংলাদেশে ‘যথাযথভাবে গঠিত’ সরকার নিয়ে শেখ হাসিনা যে মন্তব্য করেছেন, ভারত তা সমর্থন করে না।
ভারতের এই অবস্থান ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দিল্লির আচরণের তুলনায় বেশ পরিবর্তিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ওই সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ব্যাপক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগেই দিল্লির পক্ষ থেকে তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে জমে থাকা দূরত্ব কমিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে ভারতের আগ্রহ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা থেকে আপাতত বিরত রাখার বিষয়ে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। যতক্ষণ এসব আয়োজন ব্যক্তিগত উদ্যোগে হচ্ছে, ততক্ষণ সেগুলো বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ দিল্লি নেবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ভারত সরকার এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এবং ভবিষ্যতে কী করবে, সে বিষয়েও কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ, হতে পারে মোদির সঙ্গে বৈঠক
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনের একটি অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্বে থাকায় এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারত।
এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, তারেক রহমানকে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত তাঁকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্যও আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে আগামী সপ্তাহেই একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। এমনটি হলে শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের অবস্থানের কারণে তারেক রহমানের ভারত সফর অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে, এমন জল্পনার অবসান ঘটতে পারে। একই সঙ্গে তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে চাপ
অন্যদিকে, শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলনরত মানুষের ওপর তাঁর সরকারের চালানো প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের ঘটনায় এখনো অনুতপ্ত নন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য বাংলাদেশে রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের বক্তব্য, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে শেখ হাসিনাকে ভারতে থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
তবে এখানে একটি রাজনৈতিক বৈপরীত্যও রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চাইলেও তিনি যখন নিজের উদ্যোগে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন, তখন তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। এর পেছনে মূল কারণ হতে পারে, তারা শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে একজন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং বিচারের মুখোমুখি একজন দণ্ডিত ব্যক্তি হিসেবে দেখতে চায়।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে আগ্রহী। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ভারতের আগে তারেক রহমানের চীন সফর এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার বিষয়টি দিল্লির ভূরাজনৈতিক হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে। এশিয়ার দুই বড় শক্তি ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভারসাম্য এখন আঞ্চলিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণেই হয়তো নরেন্দ্র মোদি সরকারের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ বাড়ানোর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। তারেক রহমান ও মোদির সম্ভাব্য বৈঠকও দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।
দেশের ভেতরেও ভারসাম্য রাখতে হবে তারেককে
তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও সামলাতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। শেখ হাসিনার প্রতি গভীরভাবে বিরূপ একটি রাজনৈতিক ও জনসমাজকে তাঁকে বোঝাতে হবে যে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন মানেই শেখ হাসিনার বিচারের দাবি থেকে সরে আসা নয়।
বরং ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে কূটনৈতিকভাবে আরও কার্যকর অবস্থান নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে, ভারতের জন্যও বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক কোনো একক রাজনৈতিক নেতা বা দলের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলাই দিল্লির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সুত্রঃ এশিয়ানিউজ