ককরোচদের সংসদ অভিযানে ‘বাড়াবাড়ি হয়নি’, সুপ্রিম কোর্টে দিল্লি পুলিশের দাবি
মেলবোর্ন, ১৮ আগষ্ট: দিল্লির ছাত্র-যুবদের ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে কোনো অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়নি বলে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাবি করেছে দিল্লি পুলিশ। আদালতে জমা দেওয়া হলফনামায়…
মেলবোর্ন, ১৮ আগষ্ট: রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের সম্পৃক্ততা পাওয়ার দাবি করেছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্ত হয়ে আদালতে হাজিরা না দেওয়া জঙ্গিদের একটি অংশ আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে আটক ৯৮ জন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২৮ জনকে পরবর্তী সময়ে আটক করা সম্ভব হলেও এখনো ৭০ জনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এর বাইরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর আদালতে হাজিরা না দেওয়া আরও ৩৮০ জঙ্গিকে নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বোমা, বিস্ফোরক এবং বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সাভারের শ্যামপুর থেকে আরিফ ওরফে ইমরানকে আটকের পর জঙ্গিদের একটি নেটওয়ার্কের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার দাবি করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট বা সিটিটিসি। পরে তদন্ত ও অভিযানের ধারাবাহিকতায় ডেমরা থেকে বোমাসহ জুয়েল ভুঁইয়া ওরফে ‘ওস্তাদ’কে গ্রেপ্তার করা হয়।
সম্প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদার তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ ওই প্রতিবেদনকে অনুমাননির্ভর হিসেবে উল্লেখ করে জানান, সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিচ্ছে না।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, অতীতেও জঙ্গি তৎপরতার প্রাথমিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হয়েছিল। পরে সেগুলোর পেছনে সাংগঠনিক যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই কোনো সম্ভাব্য জঙ্গি তৎপরতাকে হালকাভাবে না নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের তথ্য, উৎস এবং সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলো একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবরও বিষয়টিকে হালকাভাবে না দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রশিক্ষিত সদস্য ও বড় ধরনের অর্থের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
সিটিটিসি প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ‘বোমারু মামুন’সহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা গেলে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। তাঁদের ধরতে অভিযান ও তদন্ত চলছে।
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের বা এটিইউর এপ্রিল মাসের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের বিপুলসংখ্যক সদস্য এখনো পলাতক রয়েছেন। এর মধ্যে জেএমবির ১৮৫ জন, আনসার আল ইসলামের ৮৩ জন, হিযবুত তাহ্রীরের ৫৯ জন, হুজি-বির ১৬ জন, নব্য জেএমবির ১৬ জন, আল্লাহর দলের ৯ জন, জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার একজন এবং ইমাম মাহমুদের কাফেলার একজন সদস্য রয়েছেন।
এটিইউর তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মামলায় নিষিদ্ধ উগ্রপন্থী সংগঠনের ২ হাজার ১৪৩ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৬১১ জন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন ১৬২ জন। দেশের ১৬টি কারাগারে ৫৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, ৪৬ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং ২৫ জন বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন। আরও ৩২ জনের বিচার চলছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত সিটিটিসি ১১ জনকে আটক করেছে।
সাম্প্রতিক অভিযানে ডেমরার সারুলিয়া এলাকা থেকে দুটি বোমাসহ গ্রেপ্তার জুয়েল ভুঁইয়া ওরফে ‘ওস্তাদ’ ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের একজন।
ওই সময় নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে ৮২৬ জন বন্দি পালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ৮৫টি অস্ত্র ও ৮ হাজার ১৫০টি গুলি লুট হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। ছয় দিন পর জুয়েলকে গ্রেপ্তার করা হলেও ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি জামিনে মুক্ত হন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, জুয়েল নব্য জেএমবির বোমা তৈরির কারিগর নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুনের’ ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করছিলেন।
গত রোববার বিকেলে যৌথ অভিযানে ডেমরা থেকে জুয়েলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর কথিত আস্তানা থেকে দুটি হাতবোমা উদ্ধার করে সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট।
ডিএমপির ডেমরা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহসিন মাসুদ জানান, জঙ্গি নেটওয়ার্কে জুয়েল ‘ওস্তাদ’ নামে পরিচিত। তিনি বোমারু মামুনের সহযোগী হিসেবে ওই নেটওয়ার্কে অবস্থান করছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
সিটিটিসির তথ্য অনুযায়ী, নব্য জেএমবির বোমা প্রশিক্ষক হিসেবে পরিচিত বোমারু মামুন ২০১৭ সালে রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারামুক্ত হয়ে তিনি কেরানীগঞ্জ ও সাভার এলাকায় আস্তানা গড়ে তোলেন বলে দাবি করেছে সিটিটিসি।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে শেখ আল আমিন ও মোহাম্মদ আরিফসহ অন্তত ১৫ জনকে নিয়ে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা এবং বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ শুরু করা হয়েছিল।
২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট রাজধানীর পান্থপথে হোটেল অলিও ইন্টারন্যাশনালে ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’ অভিযানে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে সাইফুল ইসলাম নিহত হন। ২০১৯ সালে দায়ের করা অভিযোগপত্রে বোমারু মামুনের নাম থাকলেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকার একটি আদালত তাঁসহ মামলার সব আসামিকে খালাস দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক তাঁদের ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী নেতা-কর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কেরানীগঞ্জে বোমা বিস্ফোরণ, যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের ওপর হামলা, কুমিল্লার একটি মন্দিরে বিস্ফোরণ, যশোরে বিস্ফোরক উদ্ধার, মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতা বোমা, সাভারে প্রেসার কুকার বোমা, ডেমরায় পাইপ বোমা এবং সায়েদাবাদে তল্লাশির সময় বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো একই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সিটিটিসির এই কর্মকর্তা দাবি করেন, কাস্টমাইজড আইইডি তৈরি করে আতঙ্ক সৃষ্টির পেছনে নব্য জেএমবির সদস্যদের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ব্লগার, লেখক ও বিদেশি নাগরিক হত্যাসহ বিভিন্ন জঙ্গি হামলার ঘটনা দেশজুড়ে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছিল। এর মধ্যে ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি। এরও আগে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে প্রায় ৫০০ বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের উপস্থিতির জানান দিয়েছিল জেএমবি।
সাম্প্রতিক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোর সঙ্গে পুরোনো জঙ্গি নেটওয়ার্কের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, পলাতক ও জামিনে থাকা জঙ্গিদের কতজন আবার সংগঠিত হচ্ছে এবং তাদের পেছনে নতুন কোনো নেটওয়ার্ক কাজ করছে কি না, তা এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au