মেলবোর্ন, ১৮ আগষ্ট: তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি, যা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিত, তাতে মিসরের যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো কায়রো আনুষ্ঠানিকভাবে এতে যুক্ত হয়নি। মিসরের এই অনীহার পেছনে সৌদি আরবের আপত্তি যেমন বড় কারণ, তেমনি ভারতের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মক্কা চুক্তিটি গত ৭ আগস্ট তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির লক্ষ্য তিন দেশের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা। কেউ কেউ এই জোটকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবেও অভিহিত করছেন। চুক্তির অংশীদাররা শুরু থেকেই আরও কয়েকটি দেশকে এর সঙ্গে যুক্ত করার আগ্রহ দেখিয়ে আসছে।
সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে মিসরের পাশাপাশি কাতার, কুয়েত, জর্ডান, আজারবাইজান ও সিরিয়ার নামও আলোচনায় রয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিসরকে এই জোটের ‘প্রাকৃতিক অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কায়রোর যোগদানের ক্ষেত্রে মূলত কিছু কারিগরি বিষয়ই এখনো বাকি রয়েছে।
তবে বাস্তবে মিসরের যোগদান এখনো নিশ্চিত নয়। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, তাঁর দেশ চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে। তবে প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে মিসরকে কী ধরনের দায়িত্ব নিতে হবে, তা নিয়ে সাংবিধানিক ও আইনি পর্যালোচনা প্রয়োজন বলেও তিনি জানান।
মিসর কেন গুরুত্বপূর্ণ
সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে মিসরকে মক্কা চুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির সামরিক বাহিনীতে ৪ লাখ ৪০ হাজারের বেশি সক্রিয় সদস্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় মিসর বিপুলসংখ্যক আধুনিক ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামও সংগ্রহ করেছে।
এ ছাড়া ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র যোগাযোগের পথ সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ মিসরের হাতে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার নিরাপত্তা কাঠামোয় কায়রোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মিসর এমন কোনো জোটে যুক্ত হতে চাইছে না, যা তার বিদ্যমান কৌশলগত সম্পর্কগুলোকে জটিল করে তুলতে পারে।
মিসরকে নিয়ে সৌদি আরবের আপত্তি
তুরস্ক যেখানে মিসরকে মক্কা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী, সেখানে সৌদি আরবের অবস্থান অনেক বেশি সতর্ক। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব আপাতত মিসরের এই জোটে যোগদানের বিরোধিতা করছে।
প্রতিবেদনে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সৌদি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সরকারের প্রতি রিয়াদের হতাশা বাড়ছে। সৌদি নেতৃত্বের একটি অংশ মনে করে, মিসর আগের মতো কৌশলগত ও সামরিক সহযোগিতা দিচ্ছে না।
২০১৩ সালে আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করতে সৌদি আরব প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছিল। কিন্তু এর বিপরীতে কায়রোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে সৌদি পক্ষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষ করে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন সংঘাতে মিসরের সীমিত ভূমিকা রিয়াদের অসন্তোষের অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে মিসরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও সৌদি আরবের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
ভারতের সঙ্গে মিসরের দীর্ঘ সম্পর্ক
মক্কা চুক্তিতে মিসরের অনীহার ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারত ও মিসরের সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ সংকটের সময় ভারত মিসরের সুয়েজ খালের ওপর নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সমর্থন করেছিল। পাঁচ বছর পর ১৯৬১ সালে ভারত গোয়া মুক্ত করার সামরিক অভিযান চালালে মিসর সুয়েজ খালের মধ্য দিয়ে পর্তুগিজদের অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর পথ বন্ধ করে দিল্লিকে সহযোগিতা করেছিল।
দুই দেশই পরবর্তীতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন কোনো সামরিক জোটে সরাসরি যুক্ত না হওয়ার নীতিতে দুই দেশই গুরুত্ব দিয়েছিল।
বর্তমানে ভারত ও মিসরের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৩ সালে দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত হয়। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি দুই দেশের সামরিক বাহিনী যৌথ মহড়ায়ও অংশ নেয়।
অর্থনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। মিসরে ৭০০টির বেশি ভারতীয় কোম্পানি নিবন্ধিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০টি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন খাতে সক্রিয়ভাবে ব্যবসা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৫.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। ভারতীয় কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে মিসরে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ও মিসরের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ভারতকে কেন বিবেচনায় রাখছে কায়রো
মিসর একই সঙ্গে ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। এসব দেশের সঙ্গে মিসরের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে।
কায়রো এমন কোনো সামরিক জোটে যোগ দিতে চাইছে না, যার কারণে এসব দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে মক্কা চুক্তিতে পাকিস্তান রয়েছে, আর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
দিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক আনাতা সেন্টার-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রাণী বাগচী বিবিসিকে বলেছেন, ভারতের বিষয়টি মিসরের সিদ্ধান্তের পেছনে ‘একটি কারণ’, তবে এটি শেষ বা প্রধান কারণ নয়।
তাঁর মতে, মিসরের ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও দেশটির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে মিসরের সম্পর্কে সরাসরি বড় ধরনের সংকট তৈরি নাও হতে পারে, তবে দিল্লির কাছে এটি ভালো বার্তা দেবে না।
মিসরের সিদ্ধান্তে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গেও তার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কায়রো ও আবুধাবির মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। একই সঙ্গে মিসর সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক সহায়তার ওপরও নির্ভরশীল।
অন্যদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আঞ্চলিক রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার আগে কায়রোকে আবুধাবির সঙ্গে নিজের সম্পর্কের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
এ ছাড়া ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতেও সরাসরি জড়িয়ে পড়তে চায় না মিসর। কারণ এতে দেশটির আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউস-এর জন্য লেখা এক বিশ্লেষণে পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আহমেদ আবুদুহ বলেন, মিসর আপাতত কোনো সামরিক ব্লকে সরাসরি যুক্ত না হয়ে জোটনিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে।
তাঁর মতে, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে মিসরকে ওই জোটের সদস্য দেশগুলোর বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপরীতে অবস্থান নিতে হতে পারে। এতে ইরান ও হুথি, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং ভারতের সঙ্গে কায়রোর সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে মিসর হয়তো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার বিনিময়ে বড় কোনো কৌশলগত সুবিধা পাবে না, অথচ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে যেতে পারে।
সব দিক বিবেচনায় মিসরের মক্কা চুক্তিতে যোগ না দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি চুক্তি প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখার চেয়ে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবের আপত্তি, তুরস্কের সঙ্গে জটিল আঞ্চলিক সমীকরণ, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাব্য প্রভাব, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং ভারতের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, সবকিছুই কায়রোর সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখছে।
বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে মিসরের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, কৌশলগত অংশীদারত্ব, সামরিক সহযোগিতা এবং বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করা কায়রোর জন্য সহজ নয়। তাই মক্কা চুক্তিতে মিসরের যোগদানের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে না গেলেও, আপাতত দেশটি কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার বদলে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ও ভারসাম্য বজায় রাখার পথেই হাঁটছে।