ককরোচদের সংসদ অভিযানে ‘বাড়াবাড়ি হয়নি’, সুপ্রিম কোর্টে দিল্লি পুলিশের দাবি
মেলবোর্ন, ১৮ আগষ্ট: দিল্লির ছাত্র-যুবদের ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে কোনো অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়নি বলে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাবি করেছে দিল্লি পুলিশ। আদালতে জমা দেওয়া হলফনামায়…
মেলবোর্ন, ১৮ আগষ্ট: ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তোষপুর বনাঞ্চলকে ‘সন্তোষপুর ইকোপার্ক’ ঘোষণা করেছে সরকার। গত ১৪ আগস্ট এ বিষয়ে গেজেট জারি করা হয়। সরকারের এ উদ্যোগে বন সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও বনাঞ্চলে বসবাসকারী কোচ বর্মণ সম্প্রদায়সহ স্থানীয় অনেকের মধ্যে উচ্ছেদ ও জমি হারানোর আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
সন্তোষপুর বনাঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ১০টি ঘরে কোচ বর্মণ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। একসময় এখানে কয়েকশ পরিবার বসবাস করলেও মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যান। বনভূমি কমে যাওয়ায় জীবিকা সংকটে পড়ে অনেকে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তবে কয়েক প্রজন্মের বসতভিটার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে এখনো কিছু পরিবার এই বনাঞ্চলেই রয়ে গেছে।
৮০ বছর বয়সী রূপালী বর্মণ তাঁদেরই একজন। তাঁর নিজের কোনো কৃষিজমি নেই। স্বামী মারা যাওয়ার পর বনের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে সন্তানদের বড় করেছেন তিনি। তাঁর কাছে এই বন শুধু বসবাসের জায়গা নয়, জীবন ও জীবিকারও অবলম্বন।
রূপালী বর্মণের আশঙ্কা, ইকোপার্ক বাস্তবায়নের কারণে যদি তাঁদের উচ্ছেদ করা হয়, তাহলে কোথায় যাবেন, কীভাবে জীবন চালাবেন, তা তিনি জানেন না। তাঁর মতো বনাঞ্চলে বসবাসকারী অন্য পরিবারগুলোর মধ্যেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে।
সন্তোষপুর বনাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতিপ্রেমী, স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ সচেতন মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র। মধুপুর বনাঞ্চলের এই এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ইকোপার্ক গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের। সরকারের গেজেটের পর বন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ইকোপার্ক ঘোষণার ফলে বনের লিজ নেওয়া জমিতে কৃষিকাজ করা মানুষ এবং দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী পরিবারগুলো জমি ও ঘরবাড়ি হারাতে পারেন। বিশেষ করে বনাঞ্চলের জমিতে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল মানুষের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করা স্থানীয় যুবক শাহজাহান বলেন, সন্তোষপুর বনাঞ্চলে কৃষিকাজের মাধ্যমে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত কলা ও আনারস স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছে। হঠাৎ করে ইকোপার্কের সিদ্ধান্তে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই জমি ও ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কা করছেন। ফলে স্থানীয়দের একটি অংশ ইকোপার্কের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানাচ্ছেন।
তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুল হাসান মিলন বলেন, ইকোপার্ক বাস্তবায়ন তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ ছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এলাকার উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। তবে কোনো মানুষকে উচ্ছেদ করে নয়, স্থানীয়দের অধিকার সংরক্ষণ করে তাঁদের সঙ্গে নিয়েই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
বন বিভাগের পক্ষ থেকেও স্থানীয়দের উচ্ছেদের আশঙ্কা নাকচ করা হয়েছে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নূরুল করিম বলেন, জনগণের বিপরীতে গিয়ে কোনো কাজ করার পরিকল্পনা বন বিভাগের নেই। ইকোপার্ক হলে সামাজিক বনায়নের অংশীদাররাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সন্তোষপুর, কৃষ্ণপুর ও রাঙ্গামাটিয়া এই তিনটি মৌজা নিয়ে সন্তোষপুর বনাঞ্চল গঠিত। পুরো বনাঞ্চলে বনভূমির পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৬৫৯ একর। এর মধ্যে ৫০ একর এলাকায় শালবন ও বেতবাগান রয়েছে। এছাড়া প্রায় ১ হাজার ২০০ একর জমিতে সামাজিক বনায়ন রয়েছে। তবে বনাঞ্চলের ১ হাজার ৫০০ একরের বেশি জমি এখনো জবরদখলে রয়েছে। এসব জমির বড় একটি অংশ প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইকোপার্ক বাস্তবায়নের আগে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত সমীক্ষা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুরাদ আহমেদ ফারুক বলেন, ইকোপার্ক প্রকল্প শুরু করার আগে এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের বর্তমান অবস্থা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বন্যপ্রাণীর জন্য একটি নিবিড় সংরক্ষণ অঞ্চল থাকা দরকার, যেখানে প্রাণীরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে এবং তাদের প্রজননসহ প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে। একই সঙ্গে স্থানীয় কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সন্তোষপুর ইকোপার্ক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অধিকার ও জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘদিনের বসতভিটা ও কৃষিজমি হারানোর আশঙ্কা দূর করে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ইকোপার্কটি পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au